ভারতে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার পর নিয়ন্ত্রণ জোরালো করার চেষ্টা করছে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। ম্যাঙ্গালুরুতে জারি করা হয়েছে কারফিউ, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট সেবা। দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দিল্লির রাজপথও। রাজধানীতে মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবাও আংশিক বন্ধ রাখা হয়েছে। আটক করা হয়েছে শত শত বিক্ষোভকারীকে। বাদ যায়নি প্রখ্যাত ইতিহাসবিদও। তবে সবকিছুর পরও রাজপথে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বিক্ষোভকারীরা।
বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে নিপীড়নের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতে সম্প্রতি আইন সংশোধন করেছে ভারত। গত ১২ ডিসেম্বর রাতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পরেই আইনে পরিণত হওয়া বিলটি শুরু থেকেই মুসলিমবিরোধী আখ্যা পেয়েছে। বিতর্কিত এই আইন প্রত্যাহারের দাবিতে দেশজুড়ে সরব একাধিক রাজনৈতিক দল। চলছে দফায় দফায় বিক্ষোভ। বৃহস্পতিবার বিক্ষোভের মধ্যে নিহত হন ম্যাঙ্গারুলুর দুজন ও লক্ষ্ণৌয়ের একজন বিক্ষোভকারী। এরপর ম্যাঙ্গালুরুতে কারফিউ জারি করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট সেবাও।
দেশজুড়ে ইতোমধ্যে বেশকিছু রাজপথে ব্যারিকেড বসিয়েছে পুলিশ। বাদ যায়নি রাজধানী দিল্লিও। বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেলও নিক্ষেপ করেছে তারা। পুলিশি নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে উত্তর প্রদেশ, ব্যাঙ্গালুরু, মুম্বাই ও দিল্লিতে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থী, অ্যাক্টিভিস্ট ও সাধারণ জনগণকে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ইন্সটাগ্রাম ও টুইটারে আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দিচ্ছেন। আন্দোলনের মুখে দিল্লির বিভিন্ন স্থানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে রাজধানী দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, ব্যাঙ্গালুরুসহ কর্ণাটকের কিছু এলাকায়। তবে পুলিশি নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
বিরোধী দলগুলোও এই আইনের বিরুদ্ধে জনগণের সঙ্গে যোগ দিয়ে মোদি নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করছে। তবে বিজেপির দাবি, এই নাগরিকত্ব আইন নিয়ে দ্বিতীয় ভাবনার কোনও সুযোগই নেই। জাতীয় নাগরিক তালিকাও বাস্তবায়ন করা হবে।
জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে তা সহিংস রুপ নেয়। পাশ্ববর্তী উত্তর প্রদেশেও সহিংস হয়ে ওঠে আন্দোলন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় বেশ কিছু বাহন। প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তারা সরকারি সম্পদ ধ্বংস করেছে তাদের চরম মূল্য দিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা প্রতিশোধ নেবো।
বিহারেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করেছে বিক্ষোভকারীরা।
দিল্লিতে মেট্রোগেট বন্ধ করা হয়েছে। বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। বেশ কিছু জায়গায় ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দিল্লির লাল কেল্লা এলাকায় জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। তবে তারপরও থামানো যায়নি শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের দাবির আওয়াজ।
বৃহস্পতিবার সবচেয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছিল লক্ষ্ণৌ। পরিস্থিতি প্রশাসনের হাতের বাইরে চলে যায়। থানায় আগুন, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এমনকি সংবাদমাধ্যমের ওবি ভ্যানে আগুন লাগানোও বাদ যায়নি। পাল্টা লাঠিচার্জ করে পুলিশ, কাঁদানে গ্যাসের সেলও নিক্ষেপ করা হয়। দুপুরে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী আহত হয়। পরে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়।
এছাড়া বিক্ষোভ থেকে আটক করা হয়েছে শত শত আন্দোলনকারীকে।আটককৃতদের মধ্যে রয়েছে বামপন্থী সিতারাম ইউচুরি, ডি রাজা, নিলোটপাল বসু ও ব্রিন্দা কারাত। অ্যাক্টিভিস্ট যোগেন্দ্র যাদব ও ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহকেও আটক করা হয়েছে।