ভারতজুড়ে এখনও চলছে দেশটির বিতর্কিত নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব আইনবিরোধী বিক্ষোভ। শুক্রবার আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দিল্লির জামে মসজিদ প্রাঙ্গন। নামাজ শেষে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি বিক্ষোভে অংশ নেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি বেঁচে থাকতে পশ্চিমবঙ্গে বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক এ নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করতে দেবেন না। মোদি সরকারের এ আইনের প্রতিবাদে লিখেছিলেন ‘নাগরিক’ শিরোনামের কবিতা। শুক্রবার মমতা লিখলেন ‘অধিকার’। ফেসবুকে পোস্ট করা ওই কবিতাজুড়ে ঘৃণা আর বিদ্বেষের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। নিচে কবিতাটি তুলে ধরা হলো।
অধিকার
আমি তো এ দেশটাকে চিনি না,
আমি তো এইখানে জন্মাইনি,
আমি জন্মেছি ভারতবর্ষে,
বিভেদ করতে শিখিনি।
আমার অধিকার আমার,
করবে কেন, কেন করবে খর্ব?
জানাই তোমায় ধিক্কার।
আমার অধিকার আমার ঠিকানা
এ দেশটাতে থাকবে,
তোমারা যারা ঘৃণা ছড়াও
তারা এবার শুধু কাঁদবে।
তোমার বক্তব্য বিষে ভরা
কাড়ছো মানুষের অধিকার,
এ দেশটা আমি চিনি না
আমার দেশটা তো সবার।
ঘৃণা নয়, ঐক্য চাই
এটা আমার অঙ্গীকার
আমরা সবাই নাগরিক
ঠিকানা মোদের অধিকার।
স্বার্থপর দৈত্য NRC, CAA
লাইনে প্রমাণ দেবো না,
গরিব মানুষ লাইন দেবে
তোমরা করবে শুধুই ছলনা!
চলবে না- চলবে না,
দেশ ভাগ চলবে না।
ঐক্যবদ্ধ ভারত থাকুক
বিভেদকারীদের চাই না,
আমরা সবাই নাগরিক-
CAA, NRC মানবো না।
সম্প্রতি কলকাতায় এক সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন বাংলায় নাগরিকত্ব আইন বা নাগরিকপঞ্জি বাস্তবায়ন করতে দেবো না। ধর্মের ভিত্তিতে দেশকে বিভক্ত করতে দেবো না। আসামে বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে। সেখানে শরণার্থী শিবির তৈরি করা হয়েছে। বাংলায় আমরা কখনই তা করতে দেবো না।’
শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে মমতা বলেন, ‘আমরা হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খ্রিস্টান সবাই একসঙ্গে থাকবো, ভালোভাবে থাকবো। শান্তিতে থাকবো। কাউকে বাংলা ছাড়তে হবে না, কাউকে দেশ ছাড়তে দেবো না। আমাদের আন্দোলন চলছে, চলবে। মানুষের আন্দোলনের জয় হবে।’
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা ভয় পাবেন না, চিন্তা করবেন না। একদম ঠিকঠাক থাকবেন, সুস্থ থাকবেন সুন্দর থাকবেন। আপনাদের চিন্তাটা আমার মাথায় দিয়ে দিন। আপনাদের চিন্তাটা আমি দেখে নেবো। অত ভাবার কোনও কারণ নেই। শান্তিতে পড়াশোনা করুন, কাজকর্ম করুন, সংসার চালান। বাদবাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দিন।’
দিল্লির মোদি সরকারকে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, “আমরা ‘দিল্লি কা লাড্ডু’র কথায় বাংলায় পথ চলি না। আমরা সবাইকে নিয়ে চলি। একসাথে চলি, একসাথে চলব। আজকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে আমার ছাত্র-ছাত্রী বন্ধুদের! ১৮ বছরে সে ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত করবে আর আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না, কী অবস্থা! প্রতিদিন ছাত্রদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে! অনেক জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে! তারা গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে আছে বলে তাদের নিষ্পেষণ করা হচ্ছে! এসব চলবে না।’
মমতা বিজেপিকে টার্গেট করে বলেন, ‘১৯৪৭ সালে যখন দেশ স্বাধীন হল তখন ওরা কোথায় ছিল? ভূমিষ্ঠই হয়নি। ১৯৮০ সালে জন্মে তাদের কাছ থেকে আমায় দেশের কথা শুনতে হবে? ১৯৮০ সালে জন্মগ্রহণ করার পরে দলটা (বিজেপি) এখন বলছে দেশ থেকে সব ভাগো! সবাইকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে? আর শুধু নিজেরা থাকবে? সবাই দেশ থেকে ভাগো, শুধু বিজেপির মাদুলি পরে ঘুরে বেড়াও। নাগরিকত্ব প্রমাণে আধার কার্ড চলবে না, প্যান কার্ড চলবে না, ভোটার তালিকা চলবে না। তাহলে কী কেবল ‘বিজেপির মাদুলি’ চলবে?’
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ওরা বলে বেড়াচ্ছে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ করবে! কিন্তু এখানে ক্ষমতায় কারা আছে? আমরা আছি। আমি আমার জীবন দিতে তৈরি আছি। কিন্তু ডিটেনশন ক্যাম্প বিজেপিকে করতে দেবো না। এটা মাথায় রাখবেন। সরকারে আমরা আছি। রাজ্য সরকার এগুলো করে। আসামে ডিটেনশন ক্যাম্প করতে পেরেছে কেন? সেখানে বিজেপির সরকার আছে বলে। ওরা দিল্লিতে আছে। ওরা নির্বাচিত সরকার। আমরাও নির্বাচিত সরকার। তোমার অধিকার দিল্লিতে। আমার অধিকার এখানে। এটা মাথায় রাখতে হবে। আমাকে আইন বেশি দেখিয়ে লাভ নেই। আমি মানুষের আশীর্বাদে সাত বার পার্লামেন্ট মেম্বার হয়েছি। দিল্লিতে পাঁচ/ছয়টা মন্ত্রণালয় সামলে এসেছি। আইন ও সংবিধান ভালো বুঝি।’ জনগণ বিপদে পড়ে এমন কোনও কাজ আমরা করবো না। সূত্র: জি নিউজ, পার্স টুডে।