নাম নূর আলম শেখ। বাগেরহাট জেলার মংলার বাসিন্দা। পর্যটক ভিসা নিয়ে ভারতে বেড়াতে এসে কলকাতার রাজপথে তিনি তুলে ধরেছিলেন ‘মোদি গো ব্যাক’ লেখা প্ল্যাকার্ড – আর তার জেরেই এখন বিরাট বিপদে পড়েছেন ওই ব্যক্তি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ভারতীয়ের রোষানলে পড়েছ্নে তিনি। এদিকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তার গতিবিধি নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কলকাতা সফর ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী গত কয়েকদিন ধরেই ছিল প্রতিবাদে উত্তাল। গত শনি ও রবিবার নাগরিকত্ব আইন ও এনআরসি’র বিরুদ্ধে বিক্ষোভে শহরের প্রাণকেন্দ্র এসপ্ল্যানেড অচল করে দিয়েছিল শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার তরুণেরা। কলকাতা বেড়াতে এসে রবিবার এসপ্ল্যানেডের সেই বিক্ষোভের মাঝখানে গিয়ে পড়েছিলেন নূর আলম শেখ, উৎসাহের আতিশয্যে তুলে ধরেছিলেন মোদির কার্টুন আঁকা ও ‘মোদি গো ব্যাক’ লেখা কালো প্ল্যাকার্ড। সেই ছবি তিনি নিজের ফেসবুকে অ্যাকাউন্টে পোস্ট করতেই বিপত্তির সূত্রপাত।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কলকাতার জনৈক গার্গী রায় সেই ছবি ও ফেসবুকে নূর আলম শেখের পরিচয় পাশাপাশি পোস্ট করে লেখেন, ‘বাংলাদেশি সাংবাদিক – কলকাতায় এসে গো ব্যাক বলছে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে! এই হচ্ছে ধর্মনিরেপেক্ষতার ফল, এই হচ্ছে বাম আন্দোলনের ফল!’
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় মন্তব্যের বন্যা। শত শত ভারতীয় নূর আলম শেখের ওয়ালে গিয়ে তাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতে শুরু করেন, যার বেশির ভাগই ছাপার অযোগ্য। বেশিরভাগ মন্তব্যেরই মূল কথা ছিল, বাংলাদেশি হয়েও কেন তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর স্পর্ধা দেখান, তাও আবার এদেশে বেড়াতে এসে!
তোপের মুখে নূর আলম শেখ ওই ছবিটিই নিজের ওয়াল থেকে সরিয়ে নেন। কিন্তু তাতেও আক্রমণের ঝাঁজ এতটুকু কমেনি, তার অন্যান্য পোস্টেও তাকে হাজারে হাজারে লোক আক্রমণ করতে শুরু করেন।
নূর আলম শেখ ফেসবুকে নিজের পরিচয় দিয়েছেন পশুর নদীর একজন ‘ওয়াটার কিপার’ (পরিবেশ সংরক্ষক) হিসেবে। তবে কিছুদিন আগে মংলা বন্দরে দুটি রণতরী এসে পৌঁছনোর ‘সংবাদ সংগ্রহে’ যাওয়ার পোস্টও তার ওয়ালে আছে, যে কারণে ভারতে অনেকে তাকে চিহ্নিত করছেন সাংবাদিক হিসেবেও।
সোমবার দুপুরের দিকে নূর আলম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের প্রোফাইল পিকচার থেকে নিজের ছবিও সরিয়ে দিয়ে সেখানে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ছবি। সুন্দরবনের কুমিরের ছবি দিয়ে বদলে দিয়েছেন কভার ফটোও – ডিলিট করে দিয়েছেন তার ভারত সফরের সব স্মৃতিও। কয়েকদিন ধরে তিনি কলকাতার সায়েন্স সিটি, হাওড়া ব্রিজ, জোড়াসাঁকো-সহ বিভিন্ন পর্যটক আকর্ষণে ঘুরে বেড়ানোর নানা ছবি পোস্ট করে যাচ্ছিলেন, এখন সে সব বেমালুম উধাও।
তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি উত্তর দেননি।
এদিকে বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে, বিদেশি পর্যটক হিসেবে ভারতে এসে নূর আলম শেখ এদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন এবং পর্যটক ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করেছেন – এই মর্মে কলকাতার বিদেশি নাগরিক নথিভুক্তকরণ দফতরে (এফআরআরও) একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র এই প্রতিবেদককে জানান, তারা অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখছেন।
এর আগে জেকব লিন্ডেনথাল নামে এক বিদেশি নাগরিককে নাগরিকত্ব আইন-বিরোধী প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গত মাসে ভারত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। জার্মান ওই ছাত্রটি চেন্নাই আইআইটি-তে পড়াশুনো করার জন্য এদেশে এসেছিলেন।
তারও আগে গত বছরের মে মাসে ভারতে লোকসভা নির্বাচনের সময় বাংলাদেশি নাগরিক ও চিত্রতারকা ফেরদৌস পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে রাজনৈতিক প্রচার করার পর তাকে ঢাকায় ফিরে যেতে হয়।