প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে চীনের পর সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। রবিবার পর্যন্ত দেশটিতে সাত হাজার ১৩৪ জনের শরীরে এ ভাইরাস পাওয়া গেছে। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও ৪৬ জন। এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে। লোকজন মাস্ক কিনতে ফার্মেসিগুলোতে ভিড় করছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লোকজনের প্রতি আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি মাস্ক না কেনার অনুরোধ জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে আগামী সোমবার থেকে মাস্ক কেনার ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালুর ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়াও হংকং, সিঙ্গাপুরের মানুষও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বিপুল পরিমাণ মাস্ক মজুদ করছে। ফলে বাজারে এর সরবরাহ কমে সংকট তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন আশঙ্কা থেকেই জনগণকে বাড়তি মাস্ক না কেনার আহ্বান জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। সোমবার থেকে দেশটিতে চালু হতে যাওয়া নতুন নিয়মে একজন ব্যক্তি সপ্তাহে কতটি মাস্ক কিনতে পারবেন তা সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হবে।
ইতোমধ্যেই মাস্ক রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশীয় কারখানাগুলোকেও উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
রবিবার জনগণের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় বাড়তি মাস্ক না কেনার অনুরোধ জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী চুং সাই-কিয়ুন। স্বাস্থ্যসেবা কর্মী এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত মাস্কের সরবরাহ নিশ্চিতে নাগরিকদের ‘সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা’র আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সত্যিকার অর্থেই যাদের প্রয়োজন তারা যেন এগুলো কিনতে পারে, তা নিশ্চিতকল্পে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
চীনে যেমন উহান শহরকে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হিসেবে দেখা হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও তেমনি দক্ষিণাঞ্চলীয় পাশাপাশি দুই শহরকে এ ভাইরাস ছড়ানোর সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ দুই শহর হচ্ছে দেগু ও চোংডো। সন্দেহের তীর গিয়ে পড়েছে ওই অঞ্চলের শিনচিওঞ্জি নামে ক্ষুদ্র একটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের দিকে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই এ সম্প্রদায়ের সদস্য।
ধারণা করা হচ্ছে, শিনচিওঞ্জিদের মাধ্যমেই দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যাপকভাবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। দেগু শহরে শিনচিওঞ্জি সম্প্রদায়ের গির্জা সংলগ্ন সড়ক জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিনচিওঞ্জি সম্প্রদায়ের নয় হাজারেরও বেশি সদস্যকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে সিউল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে কীভাবে তাদের মধ্যে এতো মানুষ আক্রান্ত হলেন!
দেগু দক্ষিণ কোরিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম শহর। ২৫ লাখ জনসংখ্যার এই শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাস্তায় মানুষজন বলতে গেলে চোখেই পড়ছে না। লোকজনের ভয়, তাদের শহরের পরিণতি না যেন উহানের মতো হয়।
কোরিয়া সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জানিয়েছে, শিনচিওঞ্জি সম্প্রদায়ের গির্জার কিছু সদস্য গত জানুয়ারিতে এ ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনের উহান শহরে গিয়েছিলেন। এই প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে তাদের ওই সফরের কোনও ভূমিকা রয়েছে কিনা তা নির্ধারণে তদন্ত করছেন দক্ষিণ কোরীয় কর্মকর্তারা।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়ে কথা বলেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার উপ স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিম গ্যাং লিপ। তিনি বলেন, গির্জা কতৃপক্ষ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বা অন্য কোনও কারণে আমাদের সহায়তা না করে তাহলে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই কর্মকর্তাদের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে ওই এলাকার একটি গির্জার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান লি ম্যান হি-র বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করতে সরকারি আইনজীবীদের নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স।