ইসরায়েলি হাসপাতালে করোনা মোকাবিলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন আরব ডাক্তার

গত ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েন ইসরায়েলের আরব ডাক্তার খিতাম হুসেন। এরপরই দ্রুত বেড়িয়ে পড়েন দেশটির করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার কাজে। ইসরায়েল সমাজে প্রায়ই প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত হওয়া আরব জনগোষ্ঠীর সদস্য হয়েও অভূতপূর্ব এই মহামারির সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে চলেছেন ৪৪ বছর বয়সী খিতাম। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘এটা মারাত্মক কঠিন কাজ, কোনও দিনই অন্য দিনের মতো নয়।’খাতিম হুসেন

ইসরায়েলের হাইফা শহরের কাছের রামবাম হাসপাতালে করোনা মোকাবিলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন খিতাম হুসেন। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় এই হাসপাতালটিতে মহামারি মোকাবিলায় দিনে ১২ ঘণ্টারও বেশি কাজ করতে হচ্ছে তাকে। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে ১৫ হাজারের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে আর মারা গেছে ২০২ জন।

খিতাম হুসেন বলেন বিশ্ব জুড়ে মহামারির মধ্যেও রোগীদের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত মুহূর্ত স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি জানান, এক বয়স্ক দম্পত্তি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। স্বামীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকায় ডাক্তাররা ওই দম্পত্তিকে শেষ মুহূর্তে একসঙ্গে থাকতে দেওয়ার অনুমতি দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা খারাপ অবস্থা সত্ত্বেও অসুস্থ স্ত্রীকে স্বামীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেই- বিদায় বলতে দেই।’ এর কিছুক্ষণ পর ওই স্বামী মারা যান। তিনি বলেন, ‘মানুষ হিসেবে এটা খুবই কঠিন, মেডিক্যালের সব কর্মীই দুঃখ পায়।’

ইসরায়েলি আরবরা ফিলিস্তিনি ভিন্নমতালম্বী। এরা ১৯৪৮ সালে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণার পর নিজেদের ভূমিতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে ইসরায়েলি জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই আরব জনগোষ্ঠী। এদের বেশিরভাগই চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত।

২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইসরায়েলি সরকার পার্লামেন্টে এক বিতর্কিত আইন পাস করে ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ইসরায়েলি আরব ও অন্য সংখ্যালঘুরা। তাদের আশঙ্কা, এতে তাদের বসবাসের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। করোনা মহামারির সময়ে স্বাস্থ্য সংকটে ওই বিতর্ক আবার সামনে এসেছে।

ইসরায়েলের প্রখ্যাত শিল্পীরা রামবাম হাসপাতালের জন্য অনলাইনে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন। এই হাসপাতালকে আরব ও ইহুদিদের সহাবস্থানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন তারা। খাতিম হুসেনও একাধিকবার পাদপ্রদীপের সামনে এসেছেন।

ইসরায়েলের পার্লামেন্টের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল এবং জাতিরাষ্ট্র আইনের সমালোচক ইয়ার লাপিড বলেছেন, নেতানিয়াহু বরাবরই আরব চিকিৎসকদের অবদানকে অবজ্ঞা করে এসেছেন। সাম্প্রতিক এক টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘একজন আরব চিকিৎসক বা নার্স  গত কয়েক সপ্তাহে দুই চোখের পাতা এক করতে পারেননি। আর আপনাদের জানা উচিত, তারা কিন্তু জাতিরাষ্ট্র আইন সংশোধন করেনি।’

২০০৯ সাল থেকে ইসরায়েলের ক্ষমতায় থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি তার প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্তজের সঙ্গে মিলে নতুন একটি সরকার গঠনের পথ চূড়ান্ত করেছেন। নেতানিয়াহুর সঙ্গে জোট গড়ায় বেনি গান্তজের সঙ্গের জোট ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন ইয়ার লাপিড।

খাতিম হুসেনের জন্য লড়াইটা জীবন রক্ষার। তাতে রোগী ইহুদি হোক বা আরব হোক। উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রামেহ শহরে জন্ম নেন খাতিম। কিন্তু এখন তার বসবাস গ্যালিলির কারমেইল শহরে। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের মহামারিতে ব্যক্তিগত জীবনেও প্রচণ্ড মূল্য দিতে হচ্ছে তাকে।

খাতিমের আইনজীবী স্বামী বাড়িতে দুই মেয়েকে নিয়ে থাকেন। আট ও দশ বছর বয়সী মেয়েদের ছেড়ে থাকাই সবচেয়ে কষ্টের বলে জানান তিনি। দীর্ঘ সময় কাজ শেষে বাড়িতে ফেরার পর জামা-কাপড় ধুয়ে নিজে গোসল সেরেই মেয়েদের কাছে যেতে পারেন তিনি। ‘বেশিরভাগ সময়ই আমি যখন ফিরি তখন তারা ঘুমিয়ে যায়। তবে কখনও কখনও তারা অপেক্ষায় থাকে’, বলেন খাতিম।

খাতিমের কোনও কোনও সহকর্মী দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণের ভয়ে বাড়িতেই ফেরেন না। খাতিম বলেন, ‘আমি নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ বন্ধ করেছি কিন্তু মেয়েদের কাছ থেকে দূরে থাকতে পারিনি। বোঝাতে পারবো না, তাদের কতটা মিস করি।’