নির্বাচনের আগেই ‘গণতন্ত্রের জীবনীশক্তি খর্ব’ করছে মিয়ানমার

বিগত কয়েক দশকের মধ্যে ২০১৫ সালে মিয়ানমারের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয় লাভ করে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক লিগ(এনএলডি)। দেশটির ডি ফ্যাক্টো রাষ্ট্রনেতা হয়ে ওঠেন নোবেল জয়ী নেত্রী অং সান সু চি। ধারণা করা হচ্ছিল এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কারের নতুন যুগ শুরু হবে। কিন্তু সেই সংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ কতটা বেড়েছে তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।Capture  

২০১৫ সালে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রবল আশাবাদ ২০১৭ সালে এসেই ধসে পড়তে শুরু করে। ওই সময় ব্যাপক নিপীড়ন, হত্যাযজ্ঞ আর অগ্নিসংযোগ থেকে বাঁচতে মিয়ানমার থেকে পালাতে বাধ্য হন প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। ওই নৃশংসতাকে অনেকেই গনহত্যা হিসেবে দেখলেও তাদের হতবাক করে দিয়ে ওই নৃশংসতার নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানান সু চি। এমনকি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পক্ষেও দাঁড়ান তিনি।

২০১৫ সালেও বৌদ্ধ ধর্মালম্বী দেশটিতেও ছিলো ধর্মীয় উত্তেজনার চিহ্ন।

ওই নির্বাচনে বিতর্কিতভাবে একজনও মুসলমান প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে অস্বীকৃতি জানায় সু চির এনএলডি। গণতন্ত্র অর্জনের সংগ্রামে কারাভোগের মতো নিপীড়ন ভোগ করেও অনেক মুসলমান নেতা সেবার মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হন।

সেবার বাদ পড়া দুই মুসলিম নেতা এবারের নির্বাচনে লড়ছেন। এতে উন্নতির সামান্য লক্ষণ দেখা গেলেও এখনও দেশটির রাজনীতি থেকে বিতাড়িত হয়ে আছে রোহিঙ্গারা।

এবারে প্রার্থী হতে পারা সিথু মং (৩৩) এবং উইন মিয়া মিয়া (৭৭) মুসলমান হলেও রোহিঙ্গা নন। তারা রবিবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে এনএলডি দলের হয়ে লড়বেন। এই দলটি এবারের নির্বাচনে আবারও বড় জয় পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও এই দুই প্রার্থী প্রচারকালে মুসলিম বিদ্বেষী নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

সিথু মংকে লক্ষ্যবস্তু বানায় দেশটির মূল বিরোধী দল সেনাবাহিনী ঘেঁষা ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। সিথু মংয়ের দিকে ইঙ্গিত করে তাকে একজন ‘কালার’ আখ্যা দেন ইউএসডিপি’র প্রখ্যাত পার্লামেন্ট সদস্য এবং কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতা মং মিয়ান্ট। দক্ষিণ এশিয়ায় এই টার্মটি মানুষের জন্য অপমানসূচক হিসেবে ব্যবহার হয়। মং মিয়ান্ট ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেন এনএলডি ৪২ জন মুসলমানকে মনোনয়ন দিয়েছে। ক্ষমতাসীন দল মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না দাবি করে তিনি বলেন, এরা পার্লামেন্টে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মং মিয়ান্ট বলেন ইউএসডিপি কখনওই এর মুসলিম সদস্যদের দাড়ি বড় করতে দেয় না।

এছাড়া উইন মিয়া মিয়ার প্রার্থীতা বাতিলের দাবিতে একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করেছে হাজার হাজার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। এনএলডির দুই মুসলিম প্রার্থী বিস্তারিত কোনও কিছু জানাতে অস্বীকার করলেও উইন মিয়া মিয়া সংক্ষেপে বলেন, ‘আমি জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। মানুষ আমাকে ভালোভাবে জানে।’

গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের নিচে

আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মান অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে মিয়ানমারের আসন্ন নির্বাচনের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোকে সেন্সর করছে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম, সরকারের সমালোচনা করা ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে আর নির্বাচন বর্জন করতে চাওয়া মানুষদের গ্রেফতার করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে। বঞ্চিত হয়েছে লাখ লাখ নৃতাত্ত্বিক রাখাইন ভোটার।  

নির্বাচনের আগের দিনও মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাং ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ফলে অভ্যুত্থানের আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।noname

কিন্তু রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার ইস্যুটির চেয়ে আর কোনও ইস্যুই সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত হয়ে ওঠেনি। মিয়ানমারে নিযুক্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুস বলেছেন, মিয়ানমার এমন সব আইন প্রণয়ন করছে যেগুলো রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করে গণতন্ত্রের জীবনিশক্তিকে খর্ব করছে।

‘তীব্র হতাশাজনক’

রোহিঙ্গা অ্যাকটিভিস্ট নায় সান লুইন বিশ্বাস করেন ক্ষমতায় ফিরে আসলে এনএলডি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল করবে। আর তা না করলে সেটি তীব্র হতাশাজনক হবে বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘১৯৮৮ সালে এনএলডি প্রতিষ্ঠার সময়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা দলটিতে যোগ দেয়। ১৯৯০’র দশকে চার রোহিঙ্গা প্রার্থী এনএলডি’র প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু এখন সু চিসহ এনএলডি সদস্যরা এমন ভাব করছেন যেন তারা একজনও রোহিঙ্গাকে চেনেন না।’

ওই চার প্রার্থীর একজন ছিলেন কিয়াও মিন। ১৯৯০ সালের বাতিল হওয়া নির্বাচনে একটি আসন থেকে জয়ও পেয়েছিলেন তিনি। সেবার তিনি সরাসরি এনএলডি’র প্রার্থী না হলেও দলটির জোটভুক্ত দল ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ফর হিউম্যান রাইটস থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। এই বছর তাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেয়নি মাইনর ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড হিউমান রাইটস পার্টি। তিনি বলেন, ‘ঘটনা হলো এই আইনের অধীনেই আমাকে ১৯৯০ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হতে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু আজ তারা বলছে আমার বাবা নাগরিক ছিলেন না।’

কিয়াও মিন বলেন, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের পূর্বে মিয়ানমারের ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন কার্ড ব্যবহার হতো। সেই কার্ডধারীদের নাগরিকত্বের মর্যাদা দেওয়া হয়নি বিশেষ করে বঞ্চিত হয়েছে রোহিঙ্গারা। তিনি বলেন, ‘তারা সংখ্যালঘুদের অধিকার দিতে চায় না কিংবা মিয়ানমারে মুসলমানদের অস্তিত্ব মেনে নিতে চায় না। তারা রাখাইন থেকে সব মুসলমানকে তাড়িয়ে দিতে চায়।’ কিয়াও মিন বলেন মনে হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও আমাদের ছেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে কেননা সরকারের ওপর কোনও চাপ নেই। তিনি বলেন, ‘দুনিয়ায় আমাদের কোনও বন্ধু নাই।’noname

প্রাক নির্বাচনি ঘৃণাবাদী বক্তব্য ও ভুল তথ্য ছড়ানো নিয়ে একটি বিশদ রিপোর্ট তৈরি করেছে বার্মা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক (বিএইচআরএন)। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এনএলডি এবং মুসলমানদের মধ্যে ষড়যন্ত্র চলছে বলে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে।

‘মারাত্মক মুসলিম বিরোধী আবেগ’

এই নির্বাচনে সিথু মংকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে প্রায় সব বিরোধীরাই। এক পোস্টে ভিত্তিহীনভাবে দাবি করা হয়েছে তিনি স্কুলের পাঠ্যক্রমে আরবি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করেছেন। আরেক পোস্টে তাকে ‘মুসলিম মিথ্যাবাদী’ ও ‘কমিউনিস্ট রাখাল’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

আরেক পোস্টে কিয়াও মিনের মেয়ে ওয়াই ওয়াই নুকে আক্রমণ করে ভিত্তিহীনভাবে বলা হয়েছে সংবিধান সংশোধন করা হলে তিনি অং সান সু চির কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেবেন। বিএইচআরএন’র রিপোর্টে সতর্ক করে আরও বলা হয়েছে নির্বাচনের পরও ব্যাপক সহিংসতা ও সংঘাতকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে ঘৃণাবাদী বক্তব্যকে সহজেই ব্যবহার করা হতে পারে।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা বিএইচআরএন বলছে, এসব ঘৃণাবাদী বক্তব্য মূলত ‘জাতীয়তাবাদী এবং সেনা সমর্থকরাই’ চালিয়েছে। এছাড়া পূর্ববর্তী ইউএসডিপি সরকারের থেকেও এনএলডি বর্তমানে বেশি করে মুসলিম বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলমানদের প্রার্থনা স্থলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনএলডি সরকার আমলেই বেশি হয়েছে। বিএইচআরএন’র প্রেসিডেন্ট কিয়াও উইন বলেন, সামরিক প্রচারণা মোকাবিলায় এনএলডি কখনওই কার্যকর কৌশল নেয়নি। এমনকি মুসলিম সমর্থকের পরিচিতি এড়ানোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থান নিয়েছে তারা।

মিয়ানমারের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যেকেই রোহিঙ্গা বিরোধী হিসেবে নিজেদের পরিচিত করতে চেয়েছে।noname

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠলেও তা থেকে সেনাবাহিনীকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড়িয়েছেন অং সান সু চি। অন্যদিকে ইউএসডিপি চেয়ারম্যান সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের অপ্রয়োজনীয় মানুষ আখ্যা দিয়ে বলেছেন মিয়ানমার তাদের গ্রহণ করতে পারে না।

রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বঞ্চনা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথেইসন বলেন, এই বছর দুই মুসলিমকে প্রার্থী করা নিশ্চয়ই উন্নতি, তবে খুব বেশি নয়। তিনি বলেন, ‘দুই মুসলিমকে প্রার্থী করায় আমি কোনওভাবেই নিকট ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে এমন আশা করছি না। রোহিঙ্গাদের মূলত মিয়ানমারের বাইরের মানুষ হিসেবে দেখা হয়।’ ডেভিড ম্যাথেইসন বলেন, ‘মিয়ানমারের মুসলমানে একটু আলাদা ভাবে দেখে, তাদের মিয়ানমারের মানুষ হিসেবে দেখলেও শর্ত হিসেবে তারা অবিশ্বাস ও নিকৃষ্ট হিসেবে দেখে।’

ম্যাথেইসন বলেন সরকারের উচিত ধর্মীয় এবং বর্ণবাদী ঘৃণা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে মুসলমানদের জন্য নিরাপদ করে তোলা। তবে খুব শিগগিরই মিয়ানমারের মুসলমান কিংবা রোহিঙ্গাদের ভাগ্যের উন্নতি হবে বলে মনে করেন না তিনি।

রোহিঙ্গা অ্যাকটিভিস্ট নায় সান লুইন মনে করেন আন্তর্জাতিক সমালোচনা এড়াতে কেবল দুই মুসলমানকে প্রার্থী করেছে এনএলডি। তবে এটি মিয়ানমারের মুসলমান বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ কোনও ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না এক দিনেই রোহিঙ্গারা আরও বেশি রাজনৈতিক অধিকার পেয়ে যাবে যদি না ক্ষমতানীন দল চলমান গণহত্যা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয়। এনএলডি যদি আমাদের এই নির্বাচনে অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছা থাকতো তাহলে সব রোহিঙ্গা প্রার্থীকেই অনুমোদন করা হতো।’ নায় সান লুইন মনে করেন রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া মিয়ানমারের নির্বাচন কোনওভাবেই অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না।

ডেভিড ম্যাথেইসনও মনে করেন কেবল রোহিঙ্গারা নয় অন্যান্য মুসলমানেরাও সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। তারপরও অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোও এনএলডি দ্বারা প্রতারিত হয়েছে বলে মনে করে। অনেকেই সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী ও এনএলডি’র মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখতে পারেন না।