ভারতে বাংলাদেশকে পরম গর্বিত করে গেলেন তারা দুই জন

একজন ড. জুনায়েদ আহমেদ, বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ। দ্বিতীয় জন ড. ইয়াসমিন আলি হক, ট্রেনিংয়ে চিকিৎসক হলেও দুনিয়া তাকে চেনে নামী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবেই। ভারতে যথাক্রমে বিশ্ব ব্যাংক ও ইউনিসেফের প্রধান হিসেবে এই দুই জন বাংলাদেশি তাদের সুদীর্ঘ ও সাফল্যমন্ডিত কার্যকাল সম্প্রতি শেষ করলেন বা করতে চলেছেন।

দুই জনের মধ্যে আর একটা মিল হলো বহু বছর ধরে বিদেশে থাকলেও তারা দুই জনই আজও বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী। ইয়াসমিন হক অবশ্য নিজের টুইটার বায়োতে ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ হিসেবেই নিজেকে পরিচয় দেন।

জুনায়েদ আহমেদ ভারতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ‘কান্ট্রি ডিরেক্টর’ হিসেবে যোগ দেন ২০১৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে। সুদীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর এই পদে কাটানোর পর অবশেষে আগামী ৩ এপ্রিল তিনি উচ্চতর দায়িত্ব নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সদর দফতর ওয়াশিংটন ডিসি-তে ফিরে যাচ্ছেন।

ঘানা, সুদান-সহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইউনিসেফ-কে নেতৃত্ব দেওয়ার পর ইয়াসমিন আলি হক ভারতে ওই সংস্থাটির ‘কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসেবে যোগ দেন ২০১৭ সালের মাঝামাঝি। সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতে জাতিসংঘের ওই সংস্থাটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর পর ডক্টর হক-ও এ বছরের জানুয়ারি মাসে ভারত ছেড়েছেন।

ভারতের উন্নয়ন কর্মসূচিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটো প্ল্যাটফর্ম বা পার্টনার হলো বিশ্ব ব্যাংক ও ইউনিসেফ। ভারতে ওই দুই সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুই জন বাংলাদেশি – তাও আবার এত লম্বা সময় ধরে – এমনটা আগে কখনও হয়নি।

ভারতীয় বা ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা বাংলাদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতৃত্ব দিয়েছেন বহুবার, কিন্তু উল্টোটা একেবারেই বিরলতম ঘটনা – আর জুনায়েদ আহমেদ আর ইয়াসমিন হক দুজনে মিলে ভারতে পুরো একটা দশক কাটিয়ে গেলেন!22

বস্তুত ভারত সরকারও তাদের দুই জনের কাজেই এতোটাই সন্তুষ্ট ছিল যে ড. আহমেদ ও ড. হক কাউকেই তারা নির্ধারিত সময়ের পরও ছাড়তে চায়নি। ড. আহমেদ যেমন প্রাথমিকভাবে চার বছরের কন্ট্রাক্টে ভারতে এলেও পরে মোদি সরকারের অনুরোধেই বিশ্ব ব্যাংক তাকে আরও দেড় বছরের জন্য রেখে দেয়। একইভাবে বাড়ানো হয়েছিল ড. হকের কার্যকালের মেয়াদও।

বস্তুত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন খুব সিনিয়র কর্মকর্তা এমনও বলছেন, ‘এই দুই জন বাংলাদেশি নাগরিক তাদের কাজের মধ্যে দিয়ে দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রোফাইলকেও একটা অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। এক কথায় বললে তারা ভারতের মাটিতে নিজের দেশকে গর্বিত করে গেছেন।’

আর একটা বিষয় হলো, জুনায়েদ আহমেদ ও ইয়াসমিন আলি হক দুজনেই ছিলেন খুব প্রচারবিমুখ। এতো লম্বা কার্যকালেও তারা ভারতীয় মিডিয়ার সামনে প্রায় আসেননি বললেই চলে – কিন্তু নীরবে নিজেদের কাজটা ঠিকই করে গেছেন।

সম্প্রতি দিল্লিতে একটি বিদায়ী অনুষ্ঠানে জুনায়েদ আহমেদ ঘনিষ্ঠজনদের সামনে প্রকারান্তরে স্বীকারই করে ফেললেন, এই ‘লো প্রোফাইলে’ থাকাটাই তাকে ভারতে এতো লম্বা সময় এতো সাফল্যের সঙ্গে কাজ করতে বিরাট সাহায্য করেছে। বস্তুত তার আমলে বিশ্ব ব্যাংক ভারতে বিভিন্ন প্রকল্পে যে পরিমাণ ঋণ দিতে পেরেছে, এর আগে বিশ্ব ব্যাংকের ইতিহাসে তা কখনও হয়নি।

বিশ্ব ব্যাংকের ‘মধ্যস্থতা’য় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এককালে সিন্ধু নদীর জল-ভাগাভাগি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী সিন্ধু ও তার পাঁচটি উপনদীর মধ্যে তিনটির জল পাকিস্তান ও তিনটির জল ভারত ব্যবহার করে থাকে। সম্প্রতি সিন্ধু অববাহিকার উজানে ভারত কয়েকটি ড্যাম নির্মাণের কাজ শুরু করার পর পাকিস্তান আপত্তি জানানোর ফলে বিশ্ব ব্যাংক আবার দুপক্ষকে মুখোমুখি আলোচনার টেবিলেও বসাতে পেরেছে – কিন্তু সেই প্রক্রিয়াও চলেছে সম্পূর্ণ সন্তর্পণে।

অন্যদিকে কন্যাশিশুদের বাঁচিয়ে রাখা, তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার বেশ কয়েক বছর আগে যে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ কর্মসূচি শুরু করেছিল – তার বাস্তবায়নে সহযোগী হিসেবে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল ইউনিসেফ ও সংস্থাটির প্রধান ইয়াসমিন হক। 

পরে কোভিড মহামারিতে ভারত যখন বিশ্বের টিকা উৎপাদনে একটি গ্লোবাল হাব বা প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন জাতিসংঘের ‘কোভ্যাক্স’ কর্মসূচিতে বিশ্বের বঞ্চিত দেশগুলোতে ভারত থেকে টিকা পাঠানোর কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয়েছিল ড. হকের নেতৃত্বে।

ফলে গত অনেকগুলো বছর ধরে দুই জন সুদক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে তাদের যে অসাধারণ কাজের ছাপ রেখে গেলেন, তাদের সেই জুতোয় পা-গলানো সহজ হবে না মোটেই!