ভিন্ন চোখে দেখা: রামায়ণের সীতা যখন নারীবাদের প্রতীক

আমাদের প্রচলিত নারীবাদী বয়ানে সীতাকে দেখা হয় পুরুষতন্ত্রের শিকার পরাজিত এক নারী হিসেবে। বলা হয়ে থাকে স্বামী রামের পুরুষতান্ত্রিক মননের যাবতীয় ইচ্ছের বাস্তবায়ন করেছেন তিনি। তবে রামায়ণের সীতাকে অন্যভাবে আবিষ্কারে প্ররোচিত হয়েছেন লেখক ও মনোবিজ্ঞানী রাশনা ইমহাসলে গান্ধী।  ভারতের ইতিহাস ও মিথকে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করায় ব্যক্তিগত আগ্রহ রয়েছে  রাশনার। লিখেছেন ‘সাইকোলজি অব লাভ- উইজডম অব ইন্ডিয়ান মিথোলজি’ এবং ‘দ্য ইমারজিং ফেমিনিন-ডিসকভারিং দ্য গডেস উইদিন’ এর মতন গ্রন্থ। রাশনা ইতিহাস  ও মিথের ভিন্ন পাঠ নিয়ে বলতে চেয়েছেন, আসলে সীতা সুদৃঢ় নারীত্বেরই প্রতীক। পুরুষতন্ত্রের বিপরীতে এক নীরব প্রতিরোধ। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকের জন্য রাশনার সেই রচনার ভাবানুবাদ তুলে ধরা হলো। 

noname 

সীতাকে লঙ্কা থেকে উদ্ধার করে অযোধ্যায় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন রাম। কিন্তু ফিরে আসার পর রাম বা প্রজাদের কারও কাছেই নিজের চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করতে দেননি সীতা। এমনকি প্রজাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রামের কৈফিয়তও তার সুদৃঢ় ব্যক্তিত্বকে এতটুকু টলাতে পারেনি। প্রতীকী অর্থে বললে, সব সীতাই এমন কঠোর অবস্থান দেখাতে পারেন, নীরবতা দিয়েই ভাঙতে পারেন সমাজ নির্মিত পুরানো ধ্যানধারণার কাঠামো।

বাল্মিকীর আশ্রমে নির্বাসিত সীতার একাই বড় করতে হয়েছে রামের দুই পুত্রকে। সে সময় সেখানে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা ছাড়া তার কাছে বেদনা লাঘবের আর কোন পথ খোলা ছিল না।

রাজা দশরথের পুত্রবধূ থেকে পথে নেমে আসতে হয়েছে সীতাকে। অভ্যস্ত হতে হয়েছে সাধারণ জীবনযাত্রায়। বাল্মিকীর সেই আশ্রম একসময় তার কাছে নিজ গৃহের মতন মনে হয়েছে। সেখানেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন মানসিক স্থিতি। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও অবকাশ পেয়ে তিনি জীবনের নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিকগুলো মিলিয়ে দেখতে পেরেছেন। সাফল্য ও ব্যর্থতা, সুখ ও দুঃখ, শোষক ও শোষিত এবং বিজয়ী ও পারাজিতকে মিলিয়ে আর তুলনা করে দেখেছেন তিনি।

এ ছাড়া তার পক্ষে সকলের সম্মিলিত বিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবেলা করা সম্ভব হতো না। তিনি প্রত্যাখ্যাত বোধ করতেন। কিন্তু গভীর অভিনিবেশ ও আত্ম-পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি এমন এক শক্তির সন্ধান পান যাতে অন্য কারও কোন ক্রিয়ায় তার মধ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। তিনি চিনতে শেখেন নিজের অনুভূতিগুলো, চিনতে শেখেন চেতন ও অবচেতন বোধগুলো।

noname

নিজের জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়ে অনেক কিছুই ভাববার অবকাশ পান সীতা। তিনি অব্যাহত যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের কারণ ঠাহর করতে পারেন। দায়িত্ব নিতে পারেন সকল ভোগান্তির। ফলে তার পক্ষে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। জীবনের ক্রান্তিকালে পৌঁছেও তাই নিজেকে পরিস্থিতির শিকার হিসেবে বিবেচনা করেন না আর।

অতীতে তিনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন, নির্বাসিত হয়েছেন। ফলে জীবনের ক্রান্তিলগ্নে এসে তিনি ধারণ করেন নীরবতা। কিন্তু যখন দ্বিতীয়বারের মতো তার কাছে নিজের পবিত্রতার প্রমাণ চাওয়া হয়, তখন বাল্মিকীই তার হয়ে সাক্ষ্য দেন। তাকে লব ও কুশের দায়িত্বশীল মাতা হিসেবে শনাক্ত করেন।

noname

জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সীতা জানতেন কী করে ইতিহাসের পট পরিবর্তন হয়। তাই তিনি আর নীরবতা ধারণ করেন না, নিজেকে পরিস্থিতির শিকার হিসেবে দেখতে চান না- অন্যের সিদ্ধান্ত নিজের ওপর চাপাতে দেন না। বরং তিনি ঘটনার সাক্ষী হিসেবে পর্যবেক্ষণ করেন সমস্ত পারিপার্শ্বিকতা।

এক পর্যায়ে সীতা নিজেকে সঁপে দেন ধরণী মাতার কাছে। এ ছাড়া কোন বিকল্পও খুঁজে পান না তিনি। কিন্তু সীতার শক্তি কখনও নিঃশেষ হয় না। এ যেন তার এক পুনর্জন্ম- একই সঙ্গে মৃত্যু আর নতুন এক জীবনের সম্মিলন।

সীতা যেন বর্তমান সমাজেরই আদিরুপ, যার নিজস্ব মতামত থাকা সত্ত্বেও তা প্রকাশ করার কোন সুযোগ তিনি পাননি। নারীত্বের প্রতীক তিনি, সাংস্কৃতিকভাবেই প্রান্তিক, যাকে পুরুষতন্ত্র কোনদিনই স্বীকার করেনি। সূত্র – দ্য স্ক্রল ডট ইন

ভাষান্তর: উম্মে রায়হানা

/ইউআর/বিএ/