এলসি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ভারতের সংবিধানে বর্ণিত নাগরিকদের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা, আইনি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান, আইন বিষয়ক সেমিনার ও আলোচনা সভা আয়োজন এবং আইনী সংস্কারের জন্য প্রচারণা চালানোর মধ্যদিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। গত ৩৫ বছরে সংবিধান এবং আইন পরিপন্থী কোনও কাজ করেনি এলসি। যেমনটা প্রতিষ্ঠানটির গঠনতন্ত্রেই বর্ণিত আছে।
এলসি-র কাজের প্রভাব ছিল বেশ বড় মাপের আর তা বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। প্রটেকশন অব উইম্যান ফ্রম ডমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্ট, ২০০৫ বাস্তবায়ন অথবা এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণকে চ্যালেঞ্জ করা (বোম্বে হাই কোর্ট, ১৯৯৭) ছিল এলসি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এলসি আইনজীবীদের দল ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে সব সময়েই ছিল সোচ্চার, যে আইনটি সমলৈঙ্গিক সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, সেই সাথে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় এবং অধিকারকে বৈধতা দেয় না। সেই সাথে জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ এবং কর্মনীতি ও কর্মসূচী নির্ধারণের ক্ষেত্রে এলসি বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গেও কাজ করেছে।
এলসি ২০০০ সাল থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদেশি অনুদান গ্রহণ করে আসছে। যা ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্টকে লঙ্ঘন করে না।
এলসি জানাচ্ছে যে, এখনও পর্যন্ত ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট-এর আওতায় এলসি-কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনও মন্ত্রণালয় থেকে কোনও নোটিশ দেওয়া হয়নি। তাদের শুধুমাত্র একটি সাধারণ প্রশ্নাবলী দেওয়া হয় গত বছরের ৫ নভেম্বর, যা চলতি বছরের ১২ জানুয়ারিতে করা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তদন্তের অংশ। এরপর তদন্তের ফলাফল জানানো হয় চলতি বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি। অথচ গত বছরের নভেম্বর থেকেই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এলসি-র বিরুদ্ধে আইন ভঙ্গের অভিযোগে ‘শো কজ’ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
অথচ গত বছর ১১ ডিসেম্বর খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, আপনাদের ৫ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে লিখিত চিঠিতে উল্লিখিত ল’ইয়ারস কালেক্টিভ-কে ‘শো কজ’ করা হয়েছে, এমন খবরের সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনও যোগাযোগ নাই এবং এমন খবর প্রকাশের কোনও দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অস্বীকার করছে।
এলসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে কাজ করে এবং অর্থনৈতিক বিষয়াদি ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট অনুসারেই তদারকি করা হয়। আমরা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত দলের পর্যবেক্ষণের জবাব দেব।
এলসি যেখানে আইনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থাশীল, সেখানে মনে হচ্ছে কর্তৃপক্ষই তাতে আস্থাহীন। আইনানুসারে, তদন্তের তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা এলসি-র প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওই তথ্য তদন্ত/অডিট দলের কাছে ফাঁস করেছেন।
গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৫ সহস্রাধিক এনজিও-র নিবন্ধন বাতিল করে। কিন্তু গ্রিন পিস ইন্ডিয়া, সবরঙ ট্রাস্ট, সিটিজেনস ফর জাস্টিজ অ্যান্ড পিস এবং এলসি ছাড়া আর কারও তথ্য বাইরে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এলসি ছাড়া বাকিদের ক্ষেত্রে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আইনী নির্দেশনা ছিল।
এলসি তার ওপর আনা ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট ভঙ্গের সকল অভিযোগ এবং আর্থিক অনিয়মের বিরোধিতা করছে। এলসি ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্টের নির্দেশনা মেনেই বিদেশি সহায়তা গ্রহণ করেছে। আমাদের আর্থিক হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশিত এবং তা যে কেউ দেখে নিতে পারেন।
স্বেচ্ছাসেবকদের বেতন দেওয়ার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট অনুযায়ী সংহতি জানানো জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের প্রাণ। এইচআইভি আক্রান্ত মানুষ, যারা গরমে সিদ্ধ হয়েও নিজের অধিকারের দাবি জানাচ্ছেন, তাদের খাদ্য এবং পানীয় জলের ব্যবস্থা করাটা রাজনৈতিক নয়, আর তা অবৈধও নয়, যেমনটা অভিযোগ করা হয়েছে। সেই সাথে সম্মেলন আয়োজন এবং তাতে অংশগ্রহণ করাটাও অবৈধ নয়, আর তা সংগঠনের উদ্দেশ্য হিসেবেই বলা আছে।
বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এলসি-র ট্রাস্টি ছিলেন ইন্দিরা জয়সিং, তিনি তখন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আর ওই সময়েও এলসি বিদেশি সহায়তা পেয়েছে, যা ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট-এর লঙ্ঘন। এটা পরিষ্কার যে, ইন্দিরা জয়সিং ‘সরকারি কর্মকর্তা’ ছিলেন না, কিন্তু ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট-এর ৩ নম্বর ধারায় ‘সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারি’-এর কথা বলা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, ভারতের বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল বেসরকারি পক্ষের হয়ে আইনি লড়াইয়ের আবেদন করেছিলেন এবং তিনি সুপ্রিম কোর্টে মদ ব্যবসায়ী সহ অন্যান্য বেসরকারি পক্ষের হয়েও আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন। তিনি সরকারি চাকরিতে থাকলে এমনটা করতে পারতেন না।
এলসি এমপি (মেম্বার অব পার্লামেন্ট) সহ সমাজের সকল অংশের মানুষের সঙ্গে এইচআইভি আক্রান্ত এবং অন্যান্য অসুরক্ষিত গোষ্ঠীর আইনী সুরক্ষার জন্য কাজ করছে। এমপি-দের কাছে জনগণের চাহিদা এবং প্রত্যাশার দাবি জানানোটা সম্পূর্ণভাবে আইনসিদ্ধ এবং সংবিধানসম্মত। আর এলসি তার সুপারিশ করার জন্য কাউকে কোনও অর্থও দেয়নি। ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট-এর ৩ নম্বর ধারায় বলা আছে, রাজনৈতিক দল এবং পার্লামেন্ট সদস্যদের বিদেশি সহায়তা থেকে কোনও অর্থ দেওয়া যাবে না। আর এলসি এই ধারা ভঙ্গ করেনি।
এটা বললে অত্যক্তি হবে না যে, এলসি এবং তার কর্মকাণ্ড, যা তার মানবিক দায়বদ্ধতা এবং উদার চিন্তার জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিচিত, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এটি এক সুচিন্তিত এবং টেকসই প্রচেষ্টা। প্রায় তিন যুগ ধরে এলসি মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের বিষয়াদি নিয়ে কাজ করছে, যা প্রায়শই রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টের কাছে অজনপ্রিয় থেকেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশি করে তার দেখা মেলে। এলসি-র ট্রাস্টি ইন্দিরা জয়সিং এবং আনন্দ গ্রোভার আইনজীবী হিসেবে তাদের পেশাদার কাজ করার সময়ে প্রিয়া পিল্লাই (গ্রিন পিস ইন্ডিয়া), তিস্তা সেতালভাদ এবং ইয়াকুব মেননের পক্ষে আইনী লড়াই করেছেন। যা সাম্প্রতিক এস্টাবলিশমেন্টের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে ইন্দিরা জয়সিং সঞ্জীব ভাট নামের গুজরাটের এক আইপিএস কর্মকর্তার পক্ষে মামলা লড়ছেন, এসআইটি (স্পেশ্যাল ইনভ্যাস্টিগেশন টিম) তার বিরুদ্ধে ভুয়া এফআইআর নথিভুক্ত করেছে উল্লেখ করে তিনি স্বতন্ত্র তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এখানে সন্দেহের অবকাশ নাই যে, এ সব প্রচেষ্টা এলসি-কে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং শক্তহাতে দমন করার জন্যই চালানো হচ্ছে। আর এর মধ্য দিয়ে নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে, সেই সাথে তা ভারতে গণতান্ত্রিক অধিকারের জায়গাটা সংকুচিত হয়ে আসছে আর সমাজের ভিন্নমতকেও দমন করা হচ্ছে।
এলসি যেমন ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষকে সাহায্য ও সহযোগিতা করছে, তেমনি প্রতিষ্ঠান এবং তার কর্মকাণ্ডকে অন্যায্য এবং বে-আইনী প্রক্রিয়ায় অনিষ্ট করার চেষ্টা করলে তা রুখে দাঁড়িয়ে সমোচিত জবাব দেওয়া হবে। এই প্রতিষ্ঠান সর্বদাই সংবিধানসম্মত উপায়ে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থাশীল। সূত্র: ল’ইয়ারস কালেক্টিভ।
/এসএ/বিএ/