বিশ্বের সবচেয়ে ‘অপছন্দনীয়’ দেশ কোনগুলো

ইন্টারনেটে বিভিন্ন পোলের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে নেটিজেনরা তাদের নিজস্ব মতামত প্রকাশ করে থাকেন, যার মধ্যে তাদের প্রিয় এবং সবচেয়ে অপছন্দনীয় দেশের নামও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, অন্য দেশগুলো সম্পর্কে মানুষের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করে। কোনও দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড, সেখানকার মূল সংস্কৃতি ও ধর্ম, কিংবা সেই দেশের পর্যটকদের আচরণ কেমন, এগুলোর ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই ধারণা বা জনমত গড়ে ওঠে।

বিশ্বের সবচেয়ে অপছন্দনীয় দেশের তালিকায় স্থান পাওয়া রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের এই নেতিবাচক ভাবমূর্তির কারণগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক:

শীর্ষ ৫-এর তালিকায় থাকা দেশসমূহ

যুক্তরাষ্ট্র: বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায়শই একটি আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে দেখা হয়। বিতর্কের জন্ম দেওয়া একের পর এক প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ শুরু করার ট্র্যাক রেকর্ড এবং ‘যেসব বিষয়ে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই, সেসব বিষয়ে নাক গলানোর’ প্রবণতার কারণে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের কাছে আমেরিকা ও মার্কিনিরা অপছন্দনীয়। ফলে এই তালিকাটির শীর্ষ ৫-এর মধ্যেই অবস্থান করছে দেশটি।

উত্তর কোরিয়া: বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়াকে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শীর্ষে থাকা দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানকার নাগরিকদের বাকস্বাধীনতার ওপর রয়েছে তীব্র নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির সরকার নির্ধারিত নিয়মের বাইরে কেউ গেলে তাকে মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমান ব্যবস্থার বিরোধিতা করলে যেকোনও নাগরিকের জন্য শ্রমশিবিরের বন্দিদশা একটি বাস্তব হুমকি।

রাশিয়া: বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণ শুরু হওয়ার পর এই পরিস্থিতি আরও খারাপ আকার ধারণ করেছে।

চীন: ১৯৮৯ সালে বেইজিংয়ের তিয়ানানমেন স্কয়ারে এক বিধ্বংসী বিক্ষোভ প্রত্যক্ষ করেছিল বিশ্ব, যেখানে কমিউনিস্ট চীনের সুরক্ষায় দেশটির পিপলস লিবারেশন আর্মি অসংখ্য সাধারণ নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নেয়। পরবর্তীতে করোনাভাইরাস মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে চীন-বিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়।

ইসরায়েল: ভক্স-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ এবং পশ্চিম তীরে অব্যাহত দখলের কারণে বিশ্বজুড়ে এই দেশটি ব্যাপক অজনপ্রিয়তার মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এই অঞ্চলে হামলা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে পড়েছে।

মানবাধিকার ও অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত দেশসমূহ

ইরান: ইরান এমন একটি দেশ যেখানে নারী ও শিশুদের অধিকার সংকুচিত। ২০২২ সালের গণবিক্ষোভে সরকারের সহিংস দমনপীড়নের কারণে দেশটি এই অপছন্দনীয় দেশের তালিকায় অষ্টম থেকে সপ্তম অবস্থানে চলে এসেছে।

আফগানিস্তান: দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা চলছে। বিশেষ করে ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে এই মৌলবাদী সরকারের অধীনে নারীদের অধিকার পুরোপুরি খর্ব করা হয়েছে।

কাতার: মানবাধিকার লঙ্ঘন, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং তীব্র অর্থনৈতিক বা ধনবৈষম্যের কারণে কাতার সমালোচিত। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের সময় কাতারের এই ত্রুটিগুলো বড় আকারে সামনে আসে। এই টুর্নামেন্টের বিভিন্ন নির্মাণকাজে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা অভিবাসী শ্রমিকদের বাধ্য করা হয়েছিল, যার ফলে দুঃখজনকভাবে হাজার হাজার শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে।

সৌদি আরব: নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে এই দেশটিতে মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।

তুরস্ক: ২০১৭ সালে জাতিসংঘ তুরস্কের বিরুদ্ধে বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে।

ভ্যাটিকান সিটি: ইতালির রোমের অভ্যন্তরে অবস্থিত বিশ্বের এই ক্ষুদ্রতম দেশটিতে পোপ বসবাস করেন এবং এটি রোমান ক্যাথলিক চার্চের সদর দফতর। চার্চের ভেতরের যৌন নিপীড়নের কেলেঙ্কারিগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার কারণে এই দেশটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র

ভারত: দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে অপুষ্টি, শিশুশ্রম, মানব পাচার এবং আধুনিক দাসত্বের অন্যান্য রূপগুলো আজও অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে টিকে রয়েছে।

পাকিস্তান: জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে একটি বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। পরবর্তীতে মার্কিন নৌবাহিনীর সিল সদস্যরা সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে খুঁজে বের করে এবং গুলি করে হত্যা করে।

অপরাধ, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা

মেক্সিকো: চমৎকার সৌন্দর্য ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশ হলেও মেক্সিকোর ভাবমূর্তি আজ দুর্নীতি এবং মাদক কার্টেলগুলোর নৃশংসতার কারণে কলঙ্কিত। কার্টেলগুলো দেশের বিশাল অঞ্চলজুড়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছে। জাতিসংঘ মেক্সিকোকে নারীদের জন্য বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে।

ইন্দোনেশিয়া: ১৯৯৮ সালে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতার কারণে ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। এই বিক্ষোভ থেকে পরবর্তীতে চীনা সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে সহস্রাধিক মানুষ নিহত হন। এছাড়া ১০০-র বেশি চীনা নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হন। দুই দশক পার হয়ে গেলেও ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসের সেই বেদনাদায়ক অধ্যায় থেকে তৈরি হওয়া জাতিগত উত্তেজনা আজও রয়ে গেছে।

নাইজেরিয়া: বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নাইজেরিয়াকে রাজনৈতিক দুর্নীতি, বোকো হারামের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছ থেকে আসা ক্রমাগত নিরাপত্তা হুমকি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে।

আলজেরিয়া: স্বৈরতান্ত্রিক সরকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অভাব এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর কঠোর দমনপীড়নের কারণে আলজেরিয়া প্রায়শই সমালোচিত হয়। এসব পদক্ষেপ দেশটির অভ্যন্তরে গণ-অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

সিরিয়া: দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে এই দেশটি বর্তমানে খণ্ডিত ও বিধ্বস্ত।

ইরাক: সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি, অপহরণ এবং সামগ্রিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্বের অনেক দেশই তাদের নাগরিকদের ইরাক ভ্রমণের ক্ষেত্রে কঠোর নিরুৎসাহ করে থাকে।

সোমালিয়া: আফ্রিকার এই দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলে জলদস্যুতা দীর্ঘ সময় ধরে একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।

ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের পরিস্থিতি

জার্মানি: চমৎকার একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও অতীতে চরমপন্থি নাৎসি পার্টির জন্মভূমি হওয়ার কারণে জার্মানির জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়।

যুক্তরাজ্য: একসময় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে বিশ্বজুড়ে শাসন করার ইতিহাসের কারণে ব্রিটেনের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে এক ধরনের অসন্তোষ রয়ে গেছে।

রোমানিয়া: ব্যাপক সরকারি দুর্নীতি, দুর্বল অবকাঠামো এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, বিশেষ করে রোমা (জিপসি) সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যের কারণে রোমানিয়া সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে।

আর্জেন্টিনা: ক্রমাগত অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে আর্জেন্টিনা সমালোচিত।

অস্ট্রেলিয়া: একটি অসাধারণ সুন্দর দেশ হওয়া সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া এই অপছন্দনীয় দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। মনে হয়, কেউ কেউ হয়তো এর সৌন্দর্যের প্রতিও বিদ্বেষ পোষণ করেন।

ইতালি: কিছু মানুষের মতে, ইতালির নাগরিকেরা অমায়িক নন এবং তারা বিদেশিদের সহজে স্বাগত জানাতে চান না।

ফিলিপাইন: সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুয়ার্তের অধীনে মাদকের বিরুদ্ধে চালানো কঠোর অভিযানের কারণে ফিলিপাইন বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়। ওই অভিযানে হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, যা পরবর্তীতে মানবাধিকার তদন্তের জন্ম দেয়।

দক্ষিণ কোরিয়া: তবে আশার কথা হলো, দক্ষিণ কোরিয়া এখন আগের চেয়ে অনেক কম ঘৃণার মুখোমুখি হচ্ছে। এর পেছনে কি কে-পপ-এর উত্থানকে কৃতিত্ব রয়েছে সম্ভবত।

তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, ভায়াবল আউটরিচ, ওয়াচ মোজো ও দ্য টপ টেন।