মমতা বনাম ঋতব্রত: দল কার, আইনসভা কার 

২০২৬ সালের মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) অভ্যন্তরে যে ফাটল দেখা দিয়েছিল, তা এখন প্রকাশ্য ও ঐতিহাসিক ভাঙনে রূপ নিয়েছে। গত ১ জুন দলবিরোধী কাজের অভিযোগে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া উলুবেড়িয়া পূর্ব কেন্দ্রের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ৩ জুন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ১৩তম বিরোধী দলনেতা (এলওপি) হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।  

তৃণমূলের মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জন বিধায়কের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের কাছ থেকে বিরোধী দলনেতার দায়িত্বও বুঝে নিয়েছেন তিনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনি লড়াই এবার সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে, যেখানে তৃণমূলের মমতাপন্থি অংশ স্পিকারের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে জরুরি শুনানির আবেদন জানিয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও কীভাবে একজন নেতা বিধানসভায় সেই দলেরই সিংহভাগ বিধায়ককে নিয়ে প্রধান বিরোধী ব্লকের মর্যাদা পান, তা নিয়ে এই মুহূর্তে তোলপাড় চলছে ভারতের রাজনৈতিক ও আইনি মহলে।  

‘সাইন-গেট’ কেলেঙ্কারি ও বিদ্রোহের সূচনা 

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই নজিরবিহীন সংকটের সূত্রপাত মূলত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে, যা রাজনৈতিক মহলে ‘সাইন-গেট’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। গত ২০ মে তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সই করা একটি চিঠিতে প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে চিফ হুইপ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।  

কিন্তু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেন যে, ওই চিঠিতে অন্তত ১৪ জন বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে (অনেকের নাম ব্লক লেটারে লেখা ছিল)। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই জালিয়াতির ঘটনায় সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই ১ জুন তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব তড়িঘড়ি ঋতব্রত ও সন্দীপনকে দল থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু এই বহিষ্কারই উল্টো ফল দেয়; ঋতব্রত মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বিধায়ককে নিজের পক্ষে সই করিয়ে স্পিকারের কাছে প্যারালাল ব্লক বা গোষ্ঠী হিসেবে দাবি পেশ করেন।  

দলত্যাগ বিরোধী আইন ও ‘দুই-তৃতীয়াংশ’ সুরক্ষাকবচ  

ভারতের সংবিধানের ১০ম তফসিল (Anti-Defection Law) অনুযায়ী, কোনও দলের নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের দলত্যাগ ঠেকানোর জন্য কঠোর নিয়ম রয়েছে। তবে সেখানে একটি বড় ছাড় বা সুরক্ষাকবচ আছে। কোনও দলের আইনসভার মোট সদস্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অংশ যদি মূল নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে অমান্য করে আলাদা ব্লক গঠন করে, তবে দলত্যাগ বিরোধী আইনের অধীনে তাদের বিধায়ক পদ খারিজ করা যায় না।  

তৃণমূলের বর্তমান বিধায়ক সংখ্যা ৮০। ফলে আইনি সুরক্ষাকবচ পাওয়ার জন্য ম্যাজিক ফিগারটি ছিল ৫৪। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ৬০ জন বিধায়কের সই জমা দেওয়ায় তারা অনায়াসেই দলত্যাগ বিরোধী আইনের ফাঁদ এড়াতে পেরেছেন। স্পিকার রথীন্দ্র বোস এই সংখ্যাতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই ঋতব্রতের গ্রুপটিকে বিধানসভার ‘প্রকৃত তৃণমূল আইনসভা দল’ (Real TMC Legislature Party) এবং প্রধান বিরোধী ব্লকের স্বীকৃতি দিয়েছেন।  

ঋতব্রতরা তৃণমূলের বিধায়ক নাকি স্বতন্ত্র  

ভারতের আইন অনুযায়ী, কোনও বিধায়ক যদি কোনও দলের টিকিটে এবং প্রতীকে (যেমন তৃণমূলের ঘাসফুল) জিতে আসেন, তবে দল থেকে বহিষ্কারের পরেও বিধানসভার রেকর্ডে তিনি সেই দলের বিধায়ক হিসেবেই গণ্য হন। আইনি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘দল থেকে বহিষ্কৃত সদস্য’ (Ex-parte Expelled Members)। 

তারা যদি নিজেদের ‘স্বতন্ত্র’ বা অন্য কোনও দলে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন, তবে দলত্যাগ বিরোধী আইনের অধীনে তাদের বিধায়ক পদ তৎক্ষণাৎ খারিজ হয়ে যাবে। সেই সূত্রে, ঋতব্রত এবং তার সঙ্গী ৬০ জন বিধায়ক এখনও টেকনিক্যালি তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক। 

আর তারা সংখ্যায় বেশি হওয়ায় বিধানসভার ভেতরে তৃণমূলের হুইপ বা নির্দেশ অমান্য করার আইনি অধিকার পেয়ে গেছেন। এখন থেকে বিধানসভার ভেতরে অভিষেক বা মমতার জারি করা হুইপ নয়, বরং ঋতব্রত ব্লকের চিফ হুইপের নির্দেশই এই ৬০ জন বিধায়কের জন্য কার্যকর হবে।  

‘মহারাষ্ট্র মডেল’ বনাম ‘বেঙ্গল চ্যাপ্টার’: মিল ও অমিল  

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সংসদীয় ‘অভ্যুত্থান’ আসলে ২০২২ সালের মহারাষ্ট্রের একনাথ শিন্ডে এবং ২০২৩ সালের অজিত পাওয়ারের নেওয়া কৌশলেরই রূপান্তর— যাকে এই মুহূর্তে ভারতীয় রাজনীতিতে ‘মহারাষ্ট্র মডেল’ বলা হচ্ছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষাপটের কারণে এই মডেলে কিছু মিল এবং অমিল দুই-ই রয়েছে।  

যদি মিলের জায়গাগুলো দেখা যায়, তবে প্রথম মিলটি হলো সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের বিরোধিতা করে দলের সুপ্রিম লিডারের প্রতি পরম ‘ভক্তি’ প্রদর্শন করা। মহারাষ্ট্রে একনাথ শিন্ডে যখন বিদ্রোহ করেন, তিনি দলের মূল প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের ছবির সামনে মাথা নত করে বলেছিলেন যে তারাই বালসাহেবের আসল সৈনিক, লড়াই শুধু উদ্ধব ঠাকরের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। বাংলায় ঋতব্রতও প্রায় একই পথে হেঁটেছেন। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘সর্বোচ্চ নেত্রী’ এবং ‘প্রধান উপদেষ্টা’ মেনে নিয়ে মূলত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করেছেন।  

দ্বিতীয়ত, শিন্ডে বা অজিত পাওয়ারের মতোই ঋতব্রত আইনি সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের সমর্থন নিশ্চিত করে তবেই মাঠে নেমেছেন। পাশাপাশি এই মডেলে মূল রাজনৈতিক দলকে স্পর্শ না করে প্রথমে আইনসভার দলের ভেতরের ক্ষমতা দখল করা হয়, যা এই দুই ঘটনার মধ্যেই হুবহু এক।  

তবে এই দুইয়ের মধ্যে বড় কিছু অমিল বা ভিন্নতাও রয়েছে। প্রথমত, মহারাষ্ট্রে শিন্ডে বা অজিত পাওয়ারের মূল লক্ষ্য ছিল বিরোধী দল বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করা এবং নিজেরা মুখ্যমন্ত্রী বা উপ-মুখ্যমন্ত্রী হওয়া। কিন্তু বাংলায় বিজেপি ইতোমধ্যেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে আছে, তাই ঋতব্রতের লক্ষ্য সরকার গঠন নয়, বরং বিধানসভার ভেতরে প্রধান বিরোধী দলনেতার পদ দখল করা।  

দ্বিতীয় অমিলটি হলো টাইমিং বা সময়ের। শিন্ডে বা অজিত পাওয়ার বিদ্রোহ করার পর দল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বা সময় পায়নি। কিন্তু বাংলায় তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব দলবিরোধী কাজের অভিযোগে ঋতব্রতকে আগেই বহিষ্কার করে। ফলে আইনিভাবে তিনি ‘বহিষ্কৃত সদস্য’ হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করেছেন।  

শেষ অমিলটি হলো দলের নাম ও প্রতীক দাবির ক্ষেত্রে। শিন্ডে ও অজিত পাওয়ার সরাসরি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে দাবি করেছিলেন যে তারাই আসল দল এবং শেষ পর্যন্ত প্রতীকের মালিকানা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু ঋতব্রত এখনই নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস দল বা ঘাসফুল প্রতীকের মালিকানা দাবি করছেন না। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের প্রতীকসহ মূল সংগঠনের প্রধান রেখেই আইনসভায় সম্পূর্ণ আলাদা ব্লকের নিয়ন্ত্রণ রাখছেন।  

‘লড়াই মমতার বিরুদ্ধে নয়, অভিষেকের বিরুদ্ধে’  

বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঋতব্রতের বক্তব্য ছিল, “আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল ও আইনসভা দলের প্রধান উপদেষ্টা থাকার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। আমাদের লড়াই ব্যক্তিবাদের বিরুদ্ধে, দলের সর্বোচ্চ নেত্রীর বিরুদ্ধে নয়।”  

এই কৌশলের পেছনে অন্যতম কারণ হলো তারা দলকে সরাসরি ভাঙার আইনি দায় নিজেদের কাঁধে না নিয়ে, বিধানসভার ভেতরে দলের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে চান।  

ঋতব্রতের এই বিদ্রোহের পাল্টা চালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন— তারা দলের সব রাজ্য, জেলা ও শাখা কমিটি বাতিল করে দিয়েছেন।  

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এই কমিটিগুলো ভেঙে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো, ঋতব্রত ব্লক যাতে আইনসভার পর এবার মাঠপর্যায়ে নেমে কোনও সমান্তরাল কমিটি বা ‘প্যারালাল বডি’ দাঁড় করাতে না পারে।  

ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান পরিস্থিতি 

দলটির ভবিষ্যৎ এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত এবং রাজ্য সিআইডি’র রিপোর্টের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।  

মমতাপন্থি ২০ জন বিধায়ক (যার মধ্যে কুণাল ঘোষ ও সদ্য মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া ফিরহাদ হাকিম রয়েছেন) দাবি করছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত কোনও নেতাকে স্পিকার বিরোধী দলনেতা করতে পারেন না। তৃণমূল এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ পিটিশন (এসএলপি) দায়ের করেছে, যার শুনানি আগামী ৮ জুন হতে পারে। তবে সুপ্রিম কোর্টের আগের রায়গুলো অনুযায়ী, আইনসভার ভেতরের সংখ্যাগরিষ্ঠতাই স্পিকারের সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি হয়।  

মমতা-অভিষেক ব্লকের বড় ভরসা এখন সিআইডি তদন্ত। ইতোমধ্যেই সিআইডি’র একটি বিশেষ দল বিধানসভায় গিয়ে স্পিকারের সচিবালয় থেকে বিধায়কদের সই করা মূল চিঠির কপি ও নথি সংগ্রহ করেছে। যদি সিআইডি তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারে যে ঋতব্রতের জমা দেওয়া ৬০টি সইয়ের মধ্যে জালিয়াতি আছে এবং সমর্থনের সংখ্যা ৫৪’র নিচে নেমে যায়, তবেই কেবল এই বিদ্রোহী বিধায়কদের পদ খারিজ করা সম্ভব হবে।  

সবমিলিয়ে আইনি মারপ্যাঁচে তৃণমূল কংগ্রেস দল, নাম এবং ঘাসফুল প্রতীক আপাতত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই থাকছে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণে, বিধানসভার ভেতরে তৃণমূলের সংসদীয় ক্ষমতার রাশ এবং ‘বিরোধী দলনেতার’ পদ চলে গেছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পকেটে।