স্বর্ণ কি ঝিলিক হারাচ্ছে

গত বছর অবিশ্বাস্য মূল্যবৃদ্ধির পর স্বর্ণের বাজারে এখন কিছুটা স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর এই পরিস্থিতি ঝুঁকির সময়ে স্বর্ণকে সবচেয়ে ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ ভাবার চিরন্তন ধারণাটিকে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে।

বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে স্বর্ণ আর নিরাপদ সম্পদ হিসেবে আচরণ করছে না। বরং এটি এখন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের মতো আচরণ করছে, যা যুদ্ধ থামার আশার খবরে বাড়ে এবং সংঘাতের ভয় বাড়লে কমে যায়। যেমন, বৃহস্পতিবার লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির খবরের পর বাজারে স্বর্ণের দাম সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। অথচ গত মার্চের মাঝামাঝিতে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেলেও বর্তমানে তা ৪ হাজার ৫০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

অবশ্য বৈশ্বিক রাজনীতিতে এখন একটি আলোচনা জোরালো যে, ওয়াশিংটন যেভাবে নিজের মুদ্রাকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই ভয়ে অনেক দেশ ডলার ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ড থেকে দূরে সরতে স্বর্ণ কিনছে।

ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) চলতি সপ্তাহের তথ্যমতে, ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়া ও তার সহযোগীদের বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ যখন মার্কিন জোট জব্দ করে দেয়, তখন সরকারগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলে ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রতিবছর ১ হাজার টনের বেশি স্বর্ণ কিনেছে, যা আগের বছরগুলোতে ছিল ৬০০ টন বা তার কম।

এরপর ২০২৫ সালে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও স্বর্ণ কেনা শুরু করলে দাম আকাশচুম্বী হয়। ইসিবি-র মতে, ২০২৪ সালে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির পর গত বছর স্বর্ণের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়ে। তবে দাম বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ কেনা কমিয়ে দেয় এবং ২০২৫ সালে তা আবার ১ হাজার টনের নিচে নেমে আসে।

বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে ছাড়িয়ে গেছে স্বর্ণ। ২০২৫ সালের শেষে বৈশ্বিক রিজার্ভে স্বর্ণের হিস্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ শতাংশে (যা আগের বছর ছিল ২০ শতাংশ)। বিপরীতে মার্কিন ট্রেজারির হিস্যা ২৫ শতাংশ থেকে কমে ২২ শতাংশে নেমেছে। অবশ্য সামগ্রিকভাবে ডলার-ভিত্তিক সম্পদ এখনও বৈশ্বিক রিজার্ভের সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশ ধরে রেখেছে।

তবে আমেরিকার আধিপত্য শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন ভাবার আগে একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। রিজার্ভে স্বর্ণের এই উল্লম্ফন মূলত দাম বাড়ার কারণে হয়েছে। অর্থাৎ দেশগুলো স্বর্ণ কম কিনলেও তাদের আগের জমানো স্বর্ণের মূল্যমান অনেক বেড়ে গেছে।

ইসিবি-র হিসাব অনুযায়ী, যদি এই মূল্যবৃদ্ধি বাদ দিয়ে ২০২৩ সালের দামের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়, তবে বৈশ্বিক রিজার্ভে স্বর্ণের প্রকৃত হিস্যা মাত্র ১৬ শতাংশ।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রবিন ব্রুকস বৃহস্পতিবার মন্তব্য করেছেন যে, মূলত স্বর্ণের যে নিরাপদ বিনিয়োগের তকমা ছিল, সেটিই এখন ধাক্কা খেয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে স্বর্ণ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের মতো আচরণ করছে; যখনই চরম ঝুঁকি তৈরি হয় তখন এর দাম পড়ে যায়, আর যখনই কোনও শান্তি চুক্তির আভাস মেলে তখনই এর দাম আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, চকচক করলেই যে স্বর্ণ নিরাপদ বিনিয়োগ হবে, এই প্রবাদটি এখন আর খাটছে না।

সূত্র: অ্যাক্সিওস