কানাডায় বাংলাদেশিকে হত্যা: ৩ ব্রিটিশ দোষী সাব্যস্ত

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী শরিফ রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে। রেস্তোরাঁর বকেয়া বিল নিয়ে প্রাণঘাতী বিরোধের পর কানাডা থেকে পালিয়ে যাওয়া তিন ব্রিটিশ নাগরিককে দোষী সাব্যস্ত করেছে ওন্টারিওর একটি আদালত। এর মধ্য দিয়ে দুই মহাদেশজুড়ে আলোচিত এই মামলার দীর্ঘ তদন্ত, গ্রেফতার ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শেষ হলো।

৪৪ বছর বয়সী শরিফ রহমান ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তা। বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা শরিফ অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর উচ্চশিক্ষার জন্য স্কটল্যান্ডে যান। সেখানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো থেকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তবে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী না হয়ে ২০১৩ সালের দিকে পরিবারসহ বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কানাডায় অভিবাসন নেন। ২০১৫ সালের মধ্যে তিনি ওন্টারিওর ওভেন সাউন্ড এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ‘দ্য কারি হাউস’ নামে একটি রেস্তোরাঁ গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে সেই রেস্তোরাঁই তার অকাল মৃত্যুর ঘটনাস্থলে পরিণত হয়।

২০২৩ সালের আগস্টে রেস্তোরাঁটির বাইরে এ ঘটনা ঘটে। একদল গ্রাহক খাবার শেষে ১৫০ ডলার (৭৯ পাউন্ড) বিল পরিশোধ না করেই চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে বিরোধের সূত্রপাত হয়। তর্কাতর্কি একপর্যায়ে রাস্তায় গড়ায় এবং তা শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। এক সন্তানের জনক শরিফ রহমানকে পরে রাস্তায় অচেতন অবস্থায় দেখতে পান তার এক কর্মী। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ওন্টারিওর লন্ডনের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান।

আটলান্টিক পাড়ি ও স্কটল্যান্ডে গ্রেফতার

হামলার পরপরই সাময়িক পর্যটন ভিসায় কানাডায় আসা সন্দেহভাজনরা দেশ ত্যাগ করেন। দীর্ঘ তদন্তের পর কানাডীয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, তারা যুক্তরাজ্যে আত্মগোপনে রয়েছেন। এরপর তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

ঘটনার এক বছরের বেশি সময় পর স্কটল্যান্ড পুলিশ অভিযান চালিয়ে এডিনবরা থেকে ২৫ বছর বয়সী রবার্ট ইভান্স জুনিয়র এবং তার বাবা ৪৯ বছর বয়সী রবার্ট বাসবি ইভান্সকে গ্রেফতার করে। একই সময়ে কাছাকাছি ডালকিথ শহর থেকে গ্রেফতার হন তার চাচা ৫৬ বছর বয়সী ব্যারি ইভান্স। তিনজনেরই বাড়ি যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে।

এডিনবরা শেরিফ কোর্টে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত প্রাথমিক শুনানিতে শেরিফ জুলিয়াস কোমোরোভস্কির সামনে বয়োজ্যেষ্ঠ দুই ইভান্সের আইনজীবীরা প্রত্যর্পণের বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল, কানাডীয় আইনের ‘অ্যাক্সেসরি আফটার দ্য ফ্যাক্ট’ (অপরাধে পরোক্ষ সহায়তা বা আড়াল করা) অপরাধের সমতুল্য কোনও ধারা স্কটিশ আইনে নেই। ফলে প্রত্যর্পণের আবেদন খারিজ করা উচিত।

তবে পরে আসামিপক্ষের অবস্থান পরিবর্তন হয়। ডিফেন্স এজেন্ট সারাহ লুসমোর আদালতকে জানান, রবার্ট বাসবি ইভান্স নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, বিষয়টির নিষ্পত্তি কানাডীয় বিচারব্যবস্থার অধীনেই হওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত তিন আসামিই স্বেচ্ছায় প্রত্যর্পণে সম্মতি দেন। এ সময় শেরিফ কোমোরোভস্কি তাদের স্পষ্ট করে জানান, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনও আপিলের সুযোগ থাকবে না।

আদালতের রায়

কানাডায় ফিরিয়ে আনার পর বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে যায়। ওন্টারিওর আদালতে রবার্ট ইভান্স জুনিয়র অন্যায়বশত নরহত্যার (ম্যানস্লটার) দায় স্বীকার করেন। অন্যদিকে তার বাবা রবার্ট বাসবি ইভান্স এবং চাচা ব্যারি ইভান্স মূল অপরাধের পর আসামিকে পালাতে সহায়তা ও তথ্য গোপনের অপরাধ স্বীকার করেন।

আদালত দুই বয়োজ্যেষ্ঠ ভাইয়ের প্রাক-বিচারকালীন হাজতবাসকে তাদের অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করে ‘টাইম সার্ভড’ বা ইতোমধ্যে খাটা মেয়াদের সাজা দিয়ে মুক্তির আদেশ দেন। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের জানান, আদালত থেকে মুক্তির পরপরই তাদের কানাডিয়ান বর্ডার সার্ভিস এজেন্সির হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠানো হবে।

এখন সবার নজর এই হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্তের চূড়ান্ত শাস্তির দিকে। রবার্ট ইভান্স জুনিয়র বর্তমানে কানাডার একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। আগামী মাসে তার আনুষ্ঠানিক সাজা ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সেদিনই বিচারক তার কারাদণ্ডের মেয়াদ ঠিক করবেন।