বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে না দিলে বর্তমানে বাজারকে স্থিতিশীল রাখার যে মজুতভিত্তিক ব্যবস্থা রয়েছে, তা গ্রীষ্মের শেষ দিকে কার্যকারিতা হারাতে পারে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির বিশ্লেষক অ্যারন ব্র্যাডি বলেন, সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ব এত দিন মজুত তেলের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু এ অবস্থা চিরদিন চলতে পারে না।
বর্তমানে বাজারে কিছুটা স্বস্তির আভাস দেখা যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি আসন্ন। যদিও দিনজুড়ে পরিস্থিতি কয়েকবার বদলেছে। তারপরও বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। শুক্রবার সকালে বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ৯৪ ডলার, যা তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, একসময় মজুত তেলের পরিমাণ এত কমে যাবে যে তা দিয়ে আর সরবরাহ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। তখন বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হবে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ম্যাককুয়ারির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শ্রমিক দিবসের (লেবার ডে) সময় পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ থেকে ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, যদি যুদ্ধ ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে, তাহলে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষায় তেলের দাম প্রায় ২০০ ডলার পর্যন্ত যেতে হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টকে তেল ও গ্যাস খাতের কয়েকজন নির্বাহী জানিয়েছেন, কিছু মজুত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফুরিয়ে যেতে পারে।
অ্যারন ব্র্যাডি বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না গেলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন স্থানের মজুত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে আসবে বলে আমরা মনে করি।
তিনি আরও বলেন, যখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, তখন বাজারে আর কোনও সরবরাহ সুরক্ষা থাকবে না। এর ফলে তেলের দাম, এমনকি পেট্রলের দামও বাড়ার চাপের মুখে পড়বে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের বিশ্লেষক ড্যানিয়েল পিকারিংও বলেছেন, গ্রীষ্মের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন সীমায় পৌঁছে যেতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক তেলের মজুত বাড়ছিল। উৎপাদন বৃদ্ধির হার চাহিদার তুলনায় বেশি ছিল। এ কারণেই তেলের দাম বাড়লেও অনেকের আশঙ্কার মতো ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার বা তারও বেশি হয়নি।
এ ছাড়া চীনের আমদানি কমে যাওয়া, সৌদি আরব ও অন্য কিছু দেশের পাইপলাইনের ব্যবহার বৃদ্ধি, কিছু ট্যাংকারের চলাচল অব্যাহত থাকা এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত মজুত ব্যবহার বাজারকে স্বস্তি দিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক তেল মজুত দ্রুত কমছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৫ জুন শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির বাণিজ্যিক অপরিশোধিত তেলের মজুত ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি কমে ৪২ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেলে নেমেছে।
একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকেও তেল সরবরাহ করছে। তবু মজুত কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল রফতানি বৃদ্ধি। এই তেল বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট সরবরাহ সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া যায়।
তবে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে তেল রফতানির ওপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপের কথা তারা বিবেচনা করছেন না।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল ও উপসাগরীয় উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ পরিশোধন বাজারগুলোতে বর্তমানে ৩৫ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে। মজুত ৩২ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে গেলে ‘বিপদসীমা’ শুরু হবে।
এক বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, মজুত এই সীমার নিচে নেমে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা ও দামের আকস্মিক উল্লম্ফনের ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যাবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বর্তমানে বাজারকে স্থিতিশীল রাখা বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে। তখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও বড় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সূত্র: অ্যাক্সিওস