চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত অ্যাসপেন আইডিয়াস: হেলথ কনফারেন্সে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের মুখে একটি বড় উদ্বেগের কথা বারবার উঠে এসেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে আধুনিক ও যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো যেভাবে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে, প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবা খাত সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
ব্যক্তিগত জিন থেরাপি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে আবিষ্কৃত ওষুধের মতো সবচেয়ে আলোচিত অগ্রগতিগুলো তখনই প্রকৃত সুবিধা দিতে পারবে, যখন প্রচলিত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো এবং বাণিজ্যিক খাত এগুলোকে সহজে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেবে। অন্যথায় এসব সম্ভাবনা শুধু কাগজ-কলমেই রয়ে যাবে।
ক্যানসার চিকিৎসা বিষয়ক এক প্যানেলে বক্তৃতাকালে বায়োমেডিক্যাল গবেষণা ও বিজ্ঞানের অভাবনীয় সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ)-এর সাবেক পরিচালক এবং ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব মেডিসিনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মনিকা বার্টাগনোলি। তবে একই সঙ্গে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, নতুন আবিষ্কারগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করা এবং এর চেয়েও বড় ও গুরুতর বিষয় হলো, যাদের সত্যিই এই যুগান্তকারী চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের সবার কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও একটি বিশাল ফারাক রয়ে গেছে।
সম্মেলনে বিভিন্ন প্যানেলে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন ভিন্ন উদীয়মান প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে এই একই ধরনের টানাপোড়েনের চিত্র তুলে ধরেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বটগুলো হয়তো সব ধরনের সম্ভাবনাময় নতুন লক্ষ্য এবং চিকিৎসার উপায় তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে, কিন্তু জীববিজ্ঞানের নিজস্ব জটিল প্রকৃতি এবং বর্তমান ব্যবস্থার অদক্ষতা এখনও নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শীর্ষস্থানীয় এআই বায়োটেক প্রতিষ্ঠান ইনসিট্রোর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড্যাফনে কোলার বলেন, একটি নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় কোন ধরনের হস্তক্ষেপ কাজ করবে, সে বিষয়ে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য অনুমানের ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতার এক বিশাল গতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের আসল যে বাধাটি দূর করা দরকার, তা হলো মূলত ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট বা এর মাঠপর্যায়ের প্রায়োগিক বিকাশ।
এআই কেবল নতুন ওষুধই আবিষ্কার করছে না, এটি গবেষকদের পুরোনো ওষুধের নতুন ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার সুযোগও করে দিচ্ছে। প্যানেলিস্ট ডেভিড ফাজেনবাম-এর অলাভজনক সংস্থা এভরি কিউর এই কাজটিই করছে এবং তারা ইতোমধ্যে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী এক ডজনেরও বেশি ওষুধ চিহ্নিত করেছে।
ওষুধ তৈরির বর্তমান ব্যবস্থাটি মূলত কোন চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক লাভ আসবে, তার ওপর ভিত্তি করে চলে। বর্তমান ব্যবস্থার এই বিশাল শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই কাজ করছে সংস্থাটি। অন্য কথায়, রোগীদের সম্ভাব্য উপকারের কথা চিন্তা না করে ওষুধের, বিশেষ করে সাধারণ ওষুধের পুনর্ব্যবহার নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বর্তমানে তেমন কোনও আর্থিক প্রণোদনা নেই।
জিন এডিটিং প্রযুক্তি অতি-দুর্লভ বা বিরল জেনেটিক রোগের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর আকাশচুম্বী খরচ এবং আইনি নিয়ন্ত্রণমূলক বাধাগুলো এখনও বড় অন্তরায়। গত বছর বেবি কেজে নামের শিশুর ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, মারাত্মক রোগে আক্রান্ত একজন একক বা নির্দিষ্ট রোগীর জন্য ব্যক্তিগত জিনগত চিকিৎসা (পারসোনালাইজড জেনেটিক থেরাপি) তৈরি করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) পরবর্তীতে এই ধরনের আরও চিকিৎসার পথ সুগম করতে একটি নিয়ন্ত্রণমূলক রুট তৈরির চেষ্টাও করেছে।
তবে অন্য রোগীদের জন্য এটিকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। ইনোভেটিভ জেনোমিক্স ইনস্টিটিউট-এর থেরাপিউটিক আরঅ্যান্ডডি (গবেষণা ও উন্নয়ন) বিভাগের পরিচালক ফিওদর উারনভ বলেন, ক্রিসপার প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগ নিরাময় করা এখন আর কোনও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়।
তবে বর্তমান খরচের কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই খরচে ক্রিসপার প্রযুক্তির কোনও ভবিষ্যৎ নেই... বেবি কেজে কেবল একটি গভীরভাবে নাড়া দেওয়া একক উদাহরণ হিসেবেই রয়ে যাবে।
তবে ব্রড ইনস্টিটিউট-এর উইনস্টন ইয়ান এ প্রসঙ্গে ভিন্ন মত দিয়ে বলেন, একটি ওষুধ কোম্পানি কখনোই একজন মাত্র রোগীর জন্য ওষুধ তৈরির পেছনে বিনিয়োগ করা খরচ তুলে আনতে পারবে না। কিন্তু এই হিসাব মেলানোর জন্য অন্যভাবে চিন্তা করার সুযোগ রয়েছে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, হাসপাতালে আপনি হয়তো কোনও ওষুধ পান, নয়তো কোনও অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যান। কীভাবে ওষুধ তৈরিকে আরও দ্রুত এবং সস্তা করা যায়, সে বিষয়ে অনেক কিছু নিয়েই কাজ হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি পুরো বিষয়টিকে ওষুধের পরিবর্তে একটি চিকিৎসা প্রক্রিয়া মতো করে চিন্তা করি, তবে কেমন হয়?
ভৌগোলিক অবস্থানও এখানে একটি সহজাত প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। ক্যানসার চিকিৎসার সব অগ্রগতি সত্ত্বেও ভৌগোলিক দূরত্বের বাধা এখনও দূর করা যায়নি। সবচেয়ে নতুন এবং উচ্চাভিলাষী চিকিৎসা সুবিধাগুলো বড় বড় শহরের নির্দিষ্ট কিছু নামী প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর অর্থ হলো, কেবল নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের মানুষই এই সব অগ্রগতি বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা পাওয়ার সুযোগ পান।
এ বিষয়ে অ্যাস্ট্রাজেনোকার মোহিত মানরাও বলেন, এটি এখনও একটি ভাগ্য পরীক্ষার মতো। উদ্ভাবনী বিজ্ঞান সামনে আসা সত্ত্বেও আপনি কোথায় বসবাস করছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে আপনার চিকিৎসার শেষ পরিণতি বা ফলাফল কী হবে।
সূত্র: অ্যাক্সিওস