সরকারের কঠোর অভিবাসন ও ভিসা নীতির কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা খাত। ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি, স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের ডিপেন্ডেন্ট নেওয়ার সুযোগ সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন লেভি আরোপের প্রভাব পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ে। এ পরিস্থিতিতে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক সংকট, কোর্স বন্ধ ও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ভিসা আবেদন ১১ শতাংশ কমেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির হার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে, এ বছর রেকর্ড ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮০০ ব্রিটিশ শিক্ষার্থী তাদের প্রথম পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধানরা বলছেন, দেশীয় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি দিয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আসা বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেশীয় শিক্ষার্থীদের বার্ষিক টিউশন ফি ৯ হাজার ২৫০ পাউন্ডে সীমাবদ্ধ রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে এই ফি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত আয়ও কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের তুলনামূলক বেশি টিউশন ফি থেকে পাওয়া অর্থ অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হয়ে উঠেছিল।
প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ওপরও
এই সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের ওপর। যুক্তরাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক ভিসা নীতি পরিবর্তনের ফলে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর ডিপেন্ডেন্ট বা পরিবারের সদস্য নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়েছে।
এ ছাড়া ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও বেড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ভিসা তথ্য বিশ্লেষণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ২০ শতাংশের বেশি হয়েছে। আগে বছরে ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য গেলেও কঠোর ভিসা নীতির পর সেই সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষার্থীপ্রতি ৯২৫ পাউন্ড লেভি এবং গ্র্যাজুয়েট রুটে পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসার মেয়াদ ২৪ মাস থেকে কমিয়ে ১৮ মাস করার প্রস্তাবও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ স্নাতকোত্তর পর্যায়ের। ফলে ডিপেন্ডেন্ট সুবিধা বন্ধ, উচ্চ টিউশন ফি এবং ভিসা নীতির কঠোরতার কারণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও আবেদনে প্রভাব পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরও।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স বন্ধ, কর্মী ছাঁটাই
যুক্তরাজ্যের শিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফিস ফর স্টুডেন্টস ধারণা করছে, জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ইংল্যান্ডের অন্তত ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় গুরুতর আর্থিক ঘাটতি বা প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থার মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে আয় কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স সংকোচন ও কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটার তাদের কর্নওয়াল ক্যাম্পাসে ভূগোল ডিগ্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গও রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় বিভিন্ন কোর্স ও বিভাগ পুনর্বিন্যাস, বন্ধ এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে গ্রিনউইচ ও কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় একীভূত হয়ে যুক্তরাজ্যের প্রথম ‘সুপার-ইউনিভার্সিটি’ গঠনের পরিকল্পনাও করছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ক্ষিতিজ কাপুরের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি পাঁচজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিভার্সিটিজ ইউকের প্রধান নির্বাহী ভিভিয়ান স্টার্ন এবং রাসেল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী লিবি হ্যাকেট সরকারকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ফি-এর ওপর অতিরিক্ত কর বাতিল এবং ভিসা নীতি শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের মতে, বর্তমান ভিসা নীতি অতিরিক্ত কড়াকড়ির দিকে চলে গেছে। দ্রুত নীতিগত পরিবর্তন আনা না হলে এর প্রভাব শুধু যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা খাতেই নয়, দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।