যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি এই আগ্রহ ঠেকাতে দেশটির অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় রিপাবলিকান পার্টিকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি।
ভ্যান্স বলেন, আবাসন ও শিক্ষার ব্যয়, ভালো বেতনের চাকরির সুযোগ এবং পরিবার গঠনের সক্ষমতা নিয়ে তরুণ আমেরিকানদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করা হলে আরও বেশি তরুণ সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
ভ্যান্স বলেন, ‘সমাজতন্ত্রের প্রতি বাড়তে থাকা এই আগ্রহের পেছনে যে অর্থনৈতিক উদ্বেগ কাজ করছে, তা আমরা শুধু উপেক্ষা করতে পারি না।’
যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ নতুন বিনিয়োগ আসছে দাবি করে ভ্যান্স বলেন, ‘এর ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তিনি আবাসনের দাম স্থিতিশীল হওয়া এবং সুদের হার কমানোর জন্য প্রশাসনের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।’ তবে এসব নীতির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
রিপাবলিকানদের উদ্দেশে সতর্ক করে ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা যদি বিষয়টি সঠিকভাবে সামলাতে না পারি, তাহলে সমাজতন্ত্রের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য তরুণদের দোষ দেওয়া উচিত হবে না। বরং আমাদের নিজেদেরই দায়ী করা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, শুধু মুক্তবাজার অর্থনীতির পক্ষে স্লোগান দিয়ে সমাজতন্ত্রের বিস্তার ঠেকানো যাবে না। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার মাধ্যমেই এর মোকাবিলা করতে হবে।
ভ্যান্সের এ মন্তব্য নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এলো। নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। মারকেট ইউনিভার্সিটি ল স্কুলের মে মাসের জাতীয় জরিপে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল মার্কিন জনগণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৭ শতাংশ মানুষ বিষয়টিকে প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা শুল্কের প্রভাবে মানুষের অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ির উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ আমেরিকানদের জন্য বাড়ির মালিক হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফোর্বসের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, জুনে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাড়ির মধ্যম চাওয়া মূল্য ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
এই অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে তরুণ আমেরিকানদের মধ্যে সমাজতন্ত্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধির বিষয়টিও সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের গ্যালাপ জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক সমাজতন্ত্রকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। অন্যদিকে ৫৪ শতাংশের পুঁজিবাদ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রয়েছে এবং ৮১ শতাংশ মুক্ত উদ্যোগ ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন। তবে তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সমাজতন্ত্র তুলনামূলকভাবে বেশি জনপ্রিয়।
নির্বাচনী রাজনীতিতেও এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারিতে প্রগতিশীল প্রার্থীরা সাফল্য পাচ্ছেন। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি, যিনি ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সদস্য, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছেন।
এর আগে ভ্যান্স অর্থনৈতিক অসন্তোষের জন্য কয়েক দশকের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের নীতিকে দায়ী করেছিলেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, মজুরির ওপর চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতি নিয়েও রিপাবলিকানদের জনসমর্থন দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। মারকেটের জরিপে অর্থনীতি পরিচালনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ছিল ৩০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তার অনুমোদনের হার আরও কম—২২ শতাংশ। একই দুটি বিষয়ে কোন দল ভালোভাবে সামলাতে পারবে—এমন প্রশ্নে রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের বেশি সমর্থন জানিয়েছেন জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা।
ভ্যান্সের বক্তব্যে তাই স্পষ্ট, তরুণদের সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং আবাসন, কর্মসংস্থান, মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বাস্তব অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সূত্র: আরটি