ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল মজুদের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল মজুদের ওপর বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটন। এই দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথের নেতৃত্বে এই চুক্তি হয়েছে। এতে মার্কিন করদাতাদের কোনো অর্থ ব্যয় হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই উদ্যোগ দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আনবে এবং সরকারের রাজস্ব বাড়াবে।
চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রগুলোতে নতুন করে অনুসন্ধান ও উৎপাদনের অধিকার দেওয়া হবে। এতে বিশেষ করে মার্কিন কোম্পানিগুলো অগ্রাধিকার পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স। প্রস্তাবিত তেলক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে অরিনোকো বেল্ট ও লেক মারাকাইবো অঞ্চল।
তবে চুক্তির কাঠামো, কোন কোন তেলক্ষেত্র বা কোম্পানি এতে যুক্ত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে তেল মজুদের ওপর ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করবে—এসব বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাননি।
রয়টার্সের দেখা একটি তালিকা অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় থাকা তেলক্ষেত্রগুলো অরিনোকো বেল্ট ও লেক মারাকাইবো অঞ্চলে অবস্থিত। ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা আগামী সপ্তাহে বেশ কয়েকটি কোম্পানিকে নতুন তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদনের অধিকার দেওয়ার চুক্তিতে সইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এসব কোম্পানির মধ্যে মার্কিন প্রতিষ্ঠানই বেশি থাকবে বলে জানা গেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চুক্তিটিকে দুই দেশের জন্যই লাভজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র স্থিতিশীল ও কম দামে তেল পাবে এবং দেশটিতে পেট্রলের দাম কমাতে সহায়তা করবে।
ভেনেজুয়েলার জন্যও চুক্তিটিকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন রুবিও। তার মতে, এতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে, হাজার হাজার উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়তা করবে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্রের উন্নয়ন করা সম্ভব হবে এবং তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যাবে। এর ফলে দেশটি প্রায় ২০৯ বিলিয়ন ডলার কর রাজস্ব পেতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
রদ্রিগেজ এক বিবৃতিতে বলেন, এসব বিনিয়োগ শুধু ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নে নয়, দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আরও ভারসাম্য তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে।
তবে চুক্তিটির আইনি ও আর্থিক কাঠামো এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বড় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এই চুক্তি কতটা কার্যকর হবে, তা বুঝতে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।
ভেনেজুয়েলার সংবিধান ও নতুন হাইড্রোকার্বন আইনের অধীনে মার্কিন সরকারের জন্য এ ধরনের ইজারা দেওয়ার আইনি ভিত্তি রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গোল্ডউইন গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের প্রেসিডেন্ট ডেভিড গোল্ডউইন বলেন, মার্কিন সরকার তেলক্ষেত্র পরিচালনার জন্য ইজারা নেবে—এমন কোনো নজির নেই।
তার মতে, ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগের পথে যেসব বাধা রয়েছে, নতুন এই ব্যবস্থা সেগুলো দূর করতে পারবে কি না, সেটিও পরিষ্কার নয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সীমিত রপ্তানি সক্ষমতা এবং তেলশিল্পে সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ—এসব এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়েছে।
তিনি বলেন, এই ধরনের ব্যবস্থা কীভাবে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিনিয়োগ বাড়াবে, তা বোঝা কঠিন।
ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুদ বিশ্বের সবচেয়ে বড়। দেশটির প্রমাণিত মজুদের পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। কিন্তু দীর্ঘদিনের কম বিনিয়োগ, অব্যবস্থাপনা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কমে গেছে।
বর্তমানে দেশটি দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে।
জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর থেকে ওয়াশিংটন দেশটির কাছ থেকে মার্কিন শোধনাগারগুলোর জন্য স্থিতিশীল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশটির তেলশিল্পে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে ভোক্তাদের উদ্বেগ কমানোর চাপও রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর। ভেনেজুয়েলা থেকে সস্তা তেল সরবরাহ এবং উৎপাদন বাড়ানো গেলে এই চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত তেল মজুদ বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভও পুনরায় পূরণ করতে চাইছে। এ জন্য মার্কিন উৎপাদকদের সঙ্গে অপরিশোধিত তেল বিনিময়ের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছে দেশটি।
ভেনেজুয়েলা ১৯৭০-এর দশকে দেশটির তেলশিল্প জাতীয়করণ করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিডিভিএসএকে তেলশিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়।
পরে প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের আমলে তেলশিল্পের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা হয়। বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত যৌথ উদ্যোগে যেতে বাধ্য করা হয় এবং পরে এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসের পরিচালিত প্রকল্পসহ বেশ কিছু সম্পদ অধিগ্রহণ করা হয়।
মাদুরোর শাসনামলে দেশটির তেল উৎপাদন আরও ব্যাপকভাবে কমে যায়।
এখন ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নাটকীয়ভাবে বাড়তে যাচ্ছে। তবে চুক্তিটির আইনি কাঠামো, বিনিয়োগ বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং বাস্তবে তেল উৎপাদন কত দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও সময় লাগবে।
সূত্র: রয়টার্স