দেয়ালে সিলভার ডাক্ট টেপ দিয়ে সাঁটানো একটি কলা। দেখলে মনে হতে পারে, এটি নিছক কোনো কৌতুক বা মজার কাণ্ড। অথচ এই কলাটিই সমকালীন শিল্পের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে এর একটি সংস্করণ নিলামে বিক্রি হয়েছে ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে।
ইতালীয় শিল্পী মরিজিও ক্যাত্তেলানের এই শিল্পকর্মের নাম ‘কমেডিয়ান’। ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে আর্ট বাসেল মিয়ামি বিচ শিল্পমেলায় প্রথম প্রদর্শিত হয় এটি। প্রদর্শনীর প্রথম দিনেই শিল্পকর্মটি ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা।
শুরুতেই বিক্রি লাখ লাখ ডলারে
‘কমেডিয়ান’-এর প্রথম দুটি সংস্করণ তখন প্রতিটি ১ লাখ ২০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। পরে তৃতীয় ও শেষ সংস্করণটি বিক্রি হয় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে।
শিল্পকর্মটির ক্রেতাদের দেওয়া হয় সত্যায়ন সনদ এবং এটি কীভাবে প্রদর্শন করতে হবে, তার নির্দেশনাও। সেখানে বলা ছিল, দেয়ালে সাঁটানো কলাটি নিয়মিত পরিবর্তন করতে হবে—কারণ আসল কলাটি তো পচে যাবে।
শিল্পমেলায় দর্শনার্থীরা কলাটির ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ভাইরাল হয়ে যায়। কেউ হাসাহাসি করেছেন, কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—দেয়ালে একটি কলা সাঁটিয়ে সেটিকে কীভাবে শিল্প বলা যায়?
বিতর্কই যেন শিল্পকর্মের সাফল্য
‘কমেডিয়ান’ নিয়ে যত সমালোচনা হয়েছে, ততই এর পরিচিতি বেড়েছে। শিল্পের জগতের বাইরেও এটি পরিচিত হয়ে ওঠে। এমনকি ডাক্ট টেপ দিয়ে দেয়ালে কলা সাঁটানোর অনুকরণে তৈরি হতে থাকে অসংখ্য মিম ও কৌতুক।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাত্তেলানের উদ্দেশ্য যদি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়ে থাকে, তাহলে ‘কমেডিয়ান’ ছিল অসাধারণ সফল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে।
এর খ্যাতি পরে এর আর্থিক মূল্যও বাড়িয়ে দেয়। ২০২৪ সালে তিনটি সংস্করণের দ্বিতীয়টি নিলামে বিক্রি হয় ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৭৫ কোটি টাকার কাছাকাছি, বিনিময় হারভেদে এর পরিমাণ কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
এত বিপুল অর্থে একটি কলা বিক্রির খবর আবারও তীব্র বিতর্ক তৈরি করে। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, একটি সাধারণ ফলের জন্য এত টাকা খরচ করার যৌক্তিকতা কী?
কলা কেন?
ক্যাট্তেলানের কলা বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস। কলার আকৃতি যেমন নানা রকম ইঙ্গিত বহন করতে পারে, তেমনি কৌতুক ও ব্যঙ্গচিত্রেও কলা বহুদিন ধরে পরিচিত একটি উপাদান।
ক্যাট্তেলানের আগে জর্জিও দে কিরিকো, অ্যান্ডি ওয়ারহল এবং গেরিলা গার্লসের মতো শিল্পীরাও তাঁদের কাজে কলা ব্যবহার করেছেন।
এর পাশাপাশি ফলমূল ও অন্যান্য দৈনন্দিন বস্তু নিয়ে শিল্পকর্ম তৈরিরও রয়েছে কয়েক শত বছরের ঐতিহ্য। ১৬ শতক থেকেই ‘স্টিল লাইফ’ বা স্থিরচিত্রে ফল, খাবার ও সাধারণ বস্তু তুলে ধরার প্রচলন ছিল।
সেসব শিল্পকর্মে প্রকৃতির জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং শিল্প কীভাবে কোনো বস্তুকে সময়ের সীমা অতিক্রম করে টিকিয়ে রাখতে পারে—এসব বিষয় তুলে ধরা হতো।
এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ‘রেডিমেড’ ধারণা
‘কমেডিয়ান’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘রেডিমেড’ শিল্পের ধারণা। অর্থাৎ শিল্পী নিজে কোনও বস্তু তৈরি না করে বাস্তব জীবনের সাধারণ কোনও বস্তুকে শিল্পের মর্যাদা দেন।
এ ধারার সবচেয়ে পরিচিত পথিকৃৎদের একজন ফরাসি শিল্পী মার্সেল দুশাঁ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই তিনি বোতল রাখার স্ট্যান্ড, সাইকেলের চাকা ও ইউরিনালের মতো দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসকে শিল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
দুশাঁর কাজের মধ্য দিয়ে মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—কোনও বস্তুকে ‘শিল্প’ বলার সিদ্ধান্ত আসলে কে নেয় এবং শিল্পের সংজ্ঞা কী?
তবে এই প্রশ্নও একেবারে নতুন নয়। শিল্প কী এবং শিল্পের মূল্য কোথায়—এ ধরনের দার্শনিক বিতর্কের শিকড় প্রাচীন গ্রিস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দার্শনিক প্লেটোও শিল্পের প্রকৃতি ও অনুকরণ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
আসলে কতটা নতুন ‘কমেডিয়ান’?
বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘কমেডিয়ান’কে যতটা বৈপ্লবিক মনে করা হয়, বাস্তবে এর প্রায় প্রতিটি উপাদানেরই পূর্বসূরি রয়েছে।
ব্যঙ্গ, উসকানি, পরিচিত বস্তু, স্থিরচিত্রের ঐতিহ্য এবং ‘রেডিমেড’—সবকিছুকে একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন ক্যাত্তেলান। তাঁর কৌশল ছিল সাধারণ একটি বস্তুকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে সেটি নিয়ে মানুষ তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে।
৬১ বছর বয়সে ক্যাত্তেলান শিল্পজগতের একজন দক্ষ ‘প্রভোকেটর’ বা বিতর্ক উসকে দেওয়া শিল্পী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। একটি কলা, একটি দেয়াল ও কিছু ডাক্ট টেপ দিয়েই তিনি যে পরিমাণ আলোচনা তৈরি করেছেন, সেটিই তাঁর কৌশলের সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই শিল্পকর্মের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ সম্ভবত এখানেই—যে বিষয়গুলো ‘কমেডিয়ান’-কে এতটা চমকপ্রদ ও বিতর্কিত করেছে, সেগুলোর কোনোটিই আসলে শিল্পের ইতিহাসে নতুন নয়।
ক্যাট্তেলানের কাজ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার মধ্যেই আগামী ১০ সেপ্টেম্বর বার্লিনের নয়ে ন্যাশনালগ্যালারিতে তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে ‘নাইট’ নামে একটি প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি