বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কড়াকড়ি’

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (হোম অফিস) কঠোর শিক্ষার্থী ভিসা নীতির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগের ওপর। নিজেদের স্পনসর লাইসেন্স রক্ষায় দেশটির বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও ‘কনফারমেশন অব অ্যাকসেপ্টেন্স ফর স্টাডিজ’ (সিএএস) দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান পুরো বাংলাদেশ থেকে আবেদন নেওয়া স্থগিত করেছে, আবার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা ও সিলেটসহ নির্দিষ্ট অঞ্চল, কোর্স বা ডিগ্রির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ভিসা ও অভিবাসন দপ্তর (ইউকেভিআই) সংশোধিত ‘বেসিক কমপ্লায়েন্স অ্যাসেসমেন্ট’ কাঠামো অনুযায়ী, কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশ বা তার বেশি হলে তাদের স্পনসর লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়। আগে এই সীমা ছিল ১০ শতাংশ।

হোম অফিসের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার প্রায় ২২ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে বাতিল হওয়া মোট শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের আবেদনকারীদের।

এই পরিস্থিতিতে স্পনসর লাইসেন্স ঝুঁকিতে পড়া এড়াতে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ, সিএএস ইস্যু বা নির্দিষ্ট কোর্সে ভর্তি সীমিত করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।

দেশজুড়ে আবেদন স্থগিত করেছে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অ্যাংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটি, কিংস্টন ইউনিভার্সিটি, কিল ইউনিভার্সিটি, রেভেনসবর্ন ইউনিভার্সিটি লন্ডন, ডি মন্টফোর্ট ইউনিভার্সিটি, অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ড, ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথ, কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি, মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব রোচ্যাম্পটন বাংলাদেশ থেকে আবেদন নেওয়া স্থগিত করেছে।

এ তালিকায় রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ার, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস ট্রিনিটি সেন্ট ডেভিড এবং শিক্ষা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘অনক্যাম্পাস সিইজি’। কিউএ হায়ার এডুকেশনের মাধ্যমে পরিচালিত ইউনিভার্সিটি অব আলস্টার ও নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটির কিছু শাখা ক্যাম্পাসও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সিএএস ইস্যু বন্ধ রেখেছে বলে জানা গেছে।

 

সিলেটের শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি কড়াকড়ি

দেশব্যাপী বিধিনিষেধের পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক কড়াকড়িতে সিলেটের শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে অভিবাসনের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কারণে এ অঞ্চলের আবেদনকারীদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কমপ্লায়েন্স টিমের বাড়তি নজর রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ফিন্যান্সিয়াল ডকুমেন্টের অসঙ্গতি, ভিসা বা ক্রেডিবিলিটি ইন্টারভিউতে ব্যর্থতা এবং যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর আশ্রয়ের আবেদনসহ বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঝুঁকি কমাতে চাইছে বলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরামর্শদাতাদের ভাষ্য।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস, অ্যাবারিস্টউইথ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার, ক্যান্টারবেরি ক্রাইস্ট চার্চ ইউনিভার্সিটি, রিজেন্ট কলেজ লন্ডন এবং ইউনিভার্সিটি অব ব্রাইটন সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ করেছে। অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব হালের কিছু শাখা ক্যাম্পাসেও একই ধরনের নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটি ঢাকা ও সিলেটের শিক্ষার্থীদের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে আবেদন গ্রহণ স্থগিত করেছে। কার্ডিফ মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি পুরো বাংলাদেশের জন্য আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে সীমাবদ্ধতা দিলেও সিলেটের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতি নিয়েছে।

অপরদিকে, ইউনিভার্সিটি অব বেডফোর্ডশায়ার ঢাকা বিভাগ ছাড়া বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার শিক্ষার্থীদের আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোর্স ও ডিগ্রিতেও বিধিনিষেধ

কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পুরো ভর্তি প্রক্রিয়া বন্ধ না করে নির্দিষ্ট কোর্স ও ডিগ্রিতে আবেদন সীমিত করেছে। বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটি ও বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এবং এমরেস (মাস্টার্স বাই রিসার্চ) কোর্সে আবেদন স্থগিত করেছে।

ইউনিভার্সিটি অব ল ও ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার সিলেটের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি নির্দিষ্ট বিজনেস ও ম্যানেজমেন্ট কোর্সে ভর্তি বন্ধ রেখেছে। ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটনও সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও নির্দিষ্ট বিজনেস কোর্সে আবেদন স্থগিত করেছে।

এ ছাড়া ইউনিভার্সিটি অব ডার্বি এবং ইউনিভার্সিটি অব গ্রেটার ম্যানচেস্টার এমরেস ও পিএইচডি পর্যায়ে ভর্তি বন্ধ রেখেছে বলে জানা গেছে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরামর্শদাতাদের ভাষ্য, এসব পদক্ষেপের পেছনে একাডেমিক বৈরিতা নয়; বরং ভিসা-সংক্রান্ত ঝুঁকি, আর্থিক নথির অসঙ্গতি, ইন্টারভিউতে ব্যর্থতা এবং যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর আশ্রয়ের আবেদন বৃদ্ধির মতো বিষয় কাজ করছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতি ও কোর্সের প্রাপ্যতা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তাই কোনও নন-রিফান্ডেবল টিউশন ফি জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে সরাসরি আবেদন গ্রহণ ও সিএএস ইস্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষা পরামর্শদাতারা।