মার্কিন নির্বাচন ২০২৪

সর্বাধিক পপুলার ভোট পেয়েও নির্বাচনে হারতে পারেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী

যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রাচীন গণতন্ত্রের দেশেও জনগণ সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে পারে না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইলেক্টোরাল কলেজ নামক একটি বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা ১৮ শতক থেকে চালু রয়েছে। এই ব্যবস্থা নিয়ে সম্প্রতি ক্রমবর্ধমান সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। কারণ কিছু ক্ষেত্রে সর্বাধিক জনপ্রিয় ভোট পেয়েও প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। বিশেষত, ২০০০ ও ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যথাক্রমে জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হন জনপ্রিয় ভোটে পরাজিত হয়েও।

ইলেক্টোরাল কলেজ কী?

মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় ধারা অনুসারে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাজ্যভিত্তিক  কংগ্রেসের প্রতিনিধির সংখ্যা অনুসারে নির্দিষ্টসংখ্যক ইলেক্টর বা নির্বাচনকর্মী নির্ধারণ করে থাকে। ৫৩৮টি ইলেক্টোরের মধ্যে একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত হতে কমপক্ষে ২৭০টি ভোট পেতে হয়। বেশিরভাগ রাজ্য ‘উইনার-টেকস-অল’ (বিজয়ীরা সব ভোট পায়) নীতি অনুসরণ করে, যেখানে রাজ্যের জনপ্রিয় ভোটে জয়ী প্রার্থী সব ইলেক্টোরাল ভোট পান। তবে মেইন ও নেব্রাস্কা ভিন্নভাবে ইলেক্টোরদের বরাদ্দ করে। এই দুই রাজ্যে রাজ্যজুড়ে জয়ী প্রার্থী কিছু ভোট পান এবং প্রতিটি কংগ্রেসনাল জেলার জয়ী প্রার্থীও ইলেক্টোরাল ভোট পেয়ে থাকেন।

ইলেক্টোরাল কলেজের সূচনা ও প্রয়োজনীয়তা

১৭৮৭ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব ছিল। শুরুতে কংগ্রেসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার প্রস্তাব আনা হলেও এতে এক্সিকিউটিভ ব্রাঞ্চ কংগ্রেসের প্রভাবাধীন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের প্রস্তাবও ছিল। কিন্তু দক্ষিণী রাজ্যগুলোর আপত্তিতে তা বাতিল হয়। তারা জনপ্রিয় ভোটে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা করে। কারণ ওই সময়ে তিন-পঞ্চমাংশ সমঝোতার আওতায় দাসদের গননা করা হলেও তাদের ভোটাধিকার ছিল না। শেষ পর্যন্ত এক বিশেষ কমিটি ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি প্রস্তাব করে। যা বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে একটি সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহীত হয়।

‘সুইং স্টেট’ বা ‘দোদুল্যমান রাজ্য’ কী?

‘সুইং স্টেট’ হচ্ছে এমন রাজ্য, যেগুলোতে উভয় প্রার্থীরই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে পেনসিলভেনিয়া, উইসকনসিন, মিশিগান, জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, অ্যারিজোনা ও নেভাডা এই ধরনের রাজ্য। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই রাজ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

মার্কিন ইতিহাসে পাঁচবার এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে জনপ্রিয় ভোটে জয়ী প্রার্থী ইলেক্টোরাল ভোটে পরাজিত হয়েছেন। এটি ইলেক্টোরাল কলেজ ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যতা ও ত্রুটি তুলে ধরে। ইলেক্টোরাল কলেজ ব্যবস্থায় প্রত্যেক রাজ্যের ইলেক্টোর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ হয়। ফলে ছোট রাজ্যগুলোর ভোটের ওজন বেশি হয়। যেমন, ক্যালিফোর্নিয়ার একজন ইলেক্টোর ৭ লক্ষাধিক মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করেন। আরও ওয়াইওমিং রাজ্যে একজন ইলেক্টোর প্রায় ২ লাখ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন।

ইলেক্টোররা কি নির্দিষ্ট প্রার্থীর জন্য ভোট দিতে বাধ্য?

প্রত্যেক রাজ্য নিজ নিজ ইলেক্টোরকে নির্ধারণ করে। যাদের সাধারণত দলের প্রতি অনুগত মনে করা হয়। তবে ২০১৬ সালে সাতজন ইলেক্টোর তাদের প্রতিশ্রুত প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেননি। অধিকাংশ রাজ্যে আইন রয়েছে যে, ইলেক্টোরদের নির্দিষ্ট প্রার্থীর জন্য ভোট দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ২০২০ সালে সিদ্ধান্ত দেয় যে রাজ্যসমূহ ইলেক্টোরদের প্রার্থিত নির্দেশনা পালনে বাধ্য করতে পারে।

ইলেক্টোরাল কলেজ বিলোপের প্রচেষ্টা

ইলেক্টোরাল কলেজ বিলোপের জন্য বহুবার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। ১৯৬৮ সালে এ বিষয়ে জাতীয় বিতর্ক হয়। কিন্তু মার্কিন সিনেটে দক্ষিণী রাজ্যগুলোর বিরোধিতার কারণে প্রস্তাবটি পাস হয়নি। সাম্প্রতিককালে ন্যাশনাল পপুলার ভোট ইন্টারস্টেট কমপ্যাক্ট উদ্যোগটি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এতে অন্তত ২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোটপ্রাপ্ত রাজ্যগুলো জাতীয় জনপ্রিয় ভোট জয়ী প্রার্থীকে ইলেক্টোরাল ভোট প্রদানের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৭টি রাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে।

ইলেক্টোরাল কলেজ বিলোপের সম্ভাবনা কতটা?

ইলেক্টোরাল কলেজ বিলোপের জন্য পপুলার ভোট ইন্টারস্টেট কমপ্যাক্ট নামে একটি উদ্যোগ রয়েছে। তবে অধিকাংশ রাজ্যে রিপাবলিকান শাসকগোষ্ঠী এই উদ্যোগে সমর্থন দেয়নি। এছাড়া, এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টি উত্থাপিত হতে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান