প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সাক্ষ্য দিলেন জাকারবার্গ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান এক ঐতিহাসিক মামলায় প্রথমবারের মতো আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মার্ক জাকারবার্গ। অভিযোগে বলা হয়েছে, মেটার মালিকানাধীন ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউব ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল যাতে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকেন। এতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে।  মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। 

মামলার কেন্দ্রীয় চরিত্র ২০ বছর বয়সী ক্যালি নামে এক তরুণী। তার অভিযোগ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি ইনস্টাগ্রামে আসক্ত হয়ে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির ইন্টারফেস তাকে দীর্ঘ সময় ব্যবহার করতে প্ররোচিত করে এবং এর ফলে তার মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও শারীরিক গড়ন নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এই মামলার রায় শত শত অনুরূপ মামলার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যেখানে অভিভাবকেরা দাবি করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের সন্তানদের ক্ষতির কারণ হয়েছে। তবে মেটা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, কিশোর ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। 

বাদীপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে মেটার অভ্যন্তরীণ নথি উপস্থাপন করেন, যেখানে ইনস্টাগ্রামের ‘রিলস’ ফিচার ব্যবহারকারীদের ইনস্টাগ্রামে সময় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী টিকটককে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও একই নথিতে তুলে ধরা হয়েছে। জাকারবার্গ বলেন, “সময় ব্যয়ের পরিসংখ্যান” ছিল প্রতিযোগিতামূলক অগ্রগতি মাপার একটি সূচক, তবে কোম্পানির লক্ষ্য স্বল্পমেয়াদি আসক্তি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারকারীদের সুবিধা তৈরি করা। ২০২২ সালের এক নথিতে ২০২৬ সালের মধ্যে ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারের দৈনিক গড় সময় বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হলেও তিনি দাবি করেন, সেগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নয়, সম্ভাব্য প্রবণতার হিসাব।

ইনস্টাগ্রামের ‘বিউটি ফিল্টার’ নিয়েও আদালতে আলোচনা হয়। বাদীপক্ষের দাবি, এসব ফিচার কিশোরীদের আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জাকারবার্গ বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিবেচনায় ফিচারগুলো পুরোপুরি বন্ধ না করে সুপারিশ তালিকা থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। আদালতে উপস্থাপিত এক অভ্যন্তরীণ ইমেইলে মেটার এক কর্মী কিশোরীদের ওপর সৌন্দর্য–সংক্রান্ত সামাজিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

নীতিমালা অনুযায়ী, ইনস্টাগ্রামে ১৩ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি নেই। তবে ২০১৫ সালের এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের শিশু-কিশোরদের প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু, যাদের বয়স ১০ থেকে ১২ বছর, তারাও এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করছিল। ২০১৯ সালের আগে নতুন ব্যবহারকারীদের জন্মতারিখ সরাসরি সংগ্রহ করা হতো না, ফলে বয়স যাচাই দুর্বল ছিল। জাকারবার্গ আদালতে বলেন, গোপনীয়তা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বয়স যাচাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, যদিও বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বয়স অনুমানের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, কিশোর ব্যবহারকারীরা ইনস্টাগ্রামের মোট আয়ের ১ শতাংশেরও কম অবদান রাখে, যদিও সমালোচকদের মতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারকারী ধরে রাখাই ছিল কোম্পানির কৌশল।

শুনানির সময় আদালতের বাইরে কয়েকজন অভিভাবক বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির কারণে তাদের সন্তানরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে মার্কিন কংগ্রেস–এ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জাকারবার্গ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন; বর্তমান শুনানিতেও সেই প্রসঙ্গ উঠে আসে। ট্যামি রদ্রিগেজ নামের এক মা দাবি করেন, তার ১১ বছর বয়সী মেয়ে ২০২১ সালে আত্মহত্যা করে, যা তিনি ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাট–এ আসক্তির সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন। তার দায়ের করা মামলার ফলও চলমান এই মামলার রায়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।