১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো মানুষ আবার চাঁদের কাছাকাছি যাচ্ছে। নাসা আর্টেমিস-২ মিশন সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে। কিন্তু এই মিশনকে সংশ্লিষ্টরা শুধু একটি উৎক্ষেপণ নয়, বরং মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে অভিহিত করছেন। নাসার প্রশাসক বিল নেলসন উৎক্ষেপণের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘এটি শুধু চাঁদে যাওয়া নয়, এটি আমাদের প্রজন্মের অ্যাপোলো মুহূর্ত। আমরা দেখাবো যে মানুষ আবার গভীর মহাকাশে পা রাখতে পারে।’
অ্যাপোলো মিশনগুলো ছিল শীতল যুদ্ধে আমেরিকা বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিযোগিতা। কিন্তু আর্টেমিস মিশন সম্পূর্ণ ভিন্ন। নাসার প্রধান গবেষক ড. এলেন স্টোফান এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, অ্যাপোলোতে আমরা পতাকা রেখে এসেছিলাম। আর্টেমিসে আমরা থাকার জন্য যাচ্ছি। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানি আছে, যা থেকে জ্বালানি ও অক্সিজেন তৈরি করা যাবে। এটি মঙ্গল যাত্রার গেটওয়ে।
আর্টেমিস-২ তাই কেবল একটি ‘ফ্লাইবাই’ মিশন নয়; এটি প্রমাণ করবে যে মানুষ আবার পৃথিবীর কক্ষপথের নিম্নাঞ্চলের বাইরে যেতে পারে, যা ছাড়া মঙ্গল বা অন্য কোনও গ্রহে যাওয়া সম্ভব নয়।
উৎক্ষেপণের আগে বিভিন্ন সমস্যায় আর্টেমিস-২। হাইড্রোজেন লিক, ব্যাটারি সেন্সর ত্রুটি, ফ্লাইট টার্মিনেশন সিস্টেমে জটিলতা। তবে আসল পরীক্ষা এখনও বাকি। সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো অরিয়ন ক্যাপসুলের হিট শিল্ড নিয়ে। মানবহীন আর্টেমিস-১ মিশনে এই হিট শিল্ডে অপ্রত্যাশিতভাবে বেশি উপাদান ক্ষয় হয়েছিল। সাবেক নভোচারী ও এয়ারোস্পেস কনসালট্যান্ট টম জোন্স সতর্ক করে বলেন, হিট শিল্ড হলো মহাকাশযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর্টেমিস-১-এ আমরা দেখেছি, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উপাদান ঝরে গেছে। নাসা বলছে তারা সমস্যা সমাধান করেছে, কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এতে একটু ফাটল ধরা মানে ক্রুদের মৃত্যু।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো বিকিরণ। জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির রেডিয়েশন ফিজিসিস্ট ড. ক্যারি জেইটলিন ব্যাখ্যা করে বলেন, আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন পৃথিবীর চুম্বকমণ্ডলের ভেতরে থাকে, যা বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু চাঁদের পথে যাওয়ার সময় অরিয়ন ভ্যান অ্যালেন বেল্ট অতিক্রম করবে, যেখানে বিকিরণ অনেক বেশি। সৌর ঝড় আচমকা দেখা দিলে ১০ দিনের মিশনও মারাত্মক হতে পারে। এই মিশনের তথ্যই আমাদের ভবিষ্যতে মঙ্গলযাত্রীদের রক্ষার পথ দেখাবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থাও একটি চ্যালেঞ্জ। মিশন কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান উৎক্ষেপণের আগে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, চাঁদের দূরবর্তী দিকে গেলে আমাদের সঙ্গে হিউস্টনের সরাসরি যোগাযোগ থাকবে না। প্রায় ২০ মিনিটের বিলম্ব হবে। মানে জরুরি পরিস্থিতিতে আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেব। এটি আমাদের প্রশিক্ষণের অংশ, কিন্তু বাস্তবে তা কতটা কঠিন, সেটাই আমরা পরীক্ষা করতে যাচ্ছি।
আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণ করেছে ঠিকই, কিন্তু বাকি মিশনগুলো বারবার পিছিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিসের পরিচালক ক্রিস হ্যান্ড্রিক্স সম্প্রতি কংগ্রেসে বলেছেন, আর্টেমিস প্রোগ্রামের বাজেট ইতোমধ্যে ৯৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা প্রাথমিক পরিকল্পনার চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। প্রতিটি উৎক্ষেপণে খরচ হয় প্রায় ৪.১ বিলিয়ন ডলার। এই হারে চললে ২০২৮ সালের চাঁদে নামার লক্ষ্য রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে নাসার বিল নেলসনের জবাব, মহাকাশ ব্যয়বহুল। কিন্তু এর থেকে প্রাপ্ত প্রযুক্তি-সৌরশক্তি, পানি পরিশোধন, দুর্যোগ পূর্বাভাস পৃথিবীর জন্য অমূল্য। আমরা থামব না।
আর্টেমিস-২-এ কানাডার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন রয়েছেন। তিনি নিজেই বলেন, আমি প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে চাঁদের কাছাকাছি যাচ্ছি। এটি আমার জন্য নয়, সমগ্র কানাডা ও আমাদের অংশীদারত্বের জন্য ঐতিহাসিক।
আর্টেমিস চুক্তিতে এখন ৩০টির বেশি দেশ স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে জাপান, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে। চীন ও রাশিয়া এ চুক্তিতে নেই। স্পেস পলিসি ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ড. স্কট পেস বলেন, মহাকাশে নতুন শীতল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমেরিকা তার মিত্রদের নিয়ে চাঁদের সম্পদ আহরণের নিয়ম নির্ধারণ করতে চায়। চীন-রাশিয়া জোট নিজেদের আলাদা চন্দ্র স্টেশন বানাচ্ছে। আর্টেমিস-২ তাই কেবল বৈজ্ঞানিক নয়, ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
আর্টেমিস-২ নিজে চাঁদে নামছে না। নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমরা গেটওয়ে। আমরা পথ তৈরি করে যাচ্ছি। ২০২৮ সালে যে নভোচারীরা চাঁদে নামবেন, তাদের জন্য আমরা নিরাপদ পথ কিনা তা পরীক্ষা করে যাব।
যদি এই মিশন সম্পূর্ণ সফল হয়, তাহলে ২০২৮ সালে মানুষ আবার চাঁদের মাটি স্পর্শ করবে, এবার আর পতাকা রেখে আসার জন্য নয়, বরং থাকার জন্য। আর সেটাই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। তবে নাসার সাবেক সেফটি অফিসার ডন ম্যাককর্সটনের সতর্কবাণী, স্পেস ফ্লাইটে কোনও গ্যারান্টি নেই। আর্টেমিস-১ সফল হয়েছিল, কিন্তু আর্টেমিস-২ মানবসহ যাচ্ছে। একটি হিট শিল্ড ব্যর্থতা বা একটি সৌর ঝড় প্রোগ্রামটিকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা