ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সারা দুনিয়ার মানুষ প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন মিডিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য শুনছেন। অনেকেই, এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা পর্যন্ত তার সেসব কথাবার্তায় বিস্ময় প্রকাশ করছেন। বলছেন, ‘একজন প্রেসিডেন্ট কীভাবে এরকম কথা বলতে পারেন!’ উনি কি পাগল হয়ে গেছেন? তার মানসিক স্থিতি কি স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই?

ট্রাম্পকে নিয়ে এমন প্রশ্ন কিন্তু নতুন নয়। অনেক আগে, যখন তিনি প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং বিজয়ীও হয়েছিলেন, তখনই এ বিষয়ে অনেক কথা হয়েছে। তারপর থেকে বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্পের মানসিক অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের লেখালেখি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন সাইকোলোজি টুডে ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর ট্রাম্পকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ট্রাম্পের স্বভাব: নার্সিসিস্টিক নয়, তবে স্বাভাবিকও নয়’। প্রতিবেদনের লেখক নাসির ঘায়েমি হলেন টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক ও হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রভাষক। 

প্রতিবেদনে লেখক বলতে চেয়েছেন, ট্রাম্পকে নার্সিসিস্টিক বলা বৈজ্ঞানিকভাবে খুব শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কারণ নার্সিসিজম ধারণাটি মূলত সিগমন্ড ফ্রয়েডের একটি পুরনো তাত্ত্বিক ধারণা এবং আধুনিক গবেষণায় নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল বলে বিবেচিত হয়েছে।

তবে লেখক যুক্তি দেন যে, ট্রাম্পের আচরণকে বোঝার জন্য ‘হাইপারথাইমিক টেম্পারামেন্ট বা অতিরিক্ত উদ্যমী/উচ্চ-উদ্দীপনামূলক ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্যের’ ধারণাটি বেশি প্রযোজ্য হতে পারে।

এখানে নার্সিসিজম বলতে এমন একটি ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্যকে বুঝানো হয় যেখানে একজন মানুষ নিজের গুরুত্ব ও ক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত উচ্চ ধারণা পোষণ করে এবং অন্যদের তুলনায় নিজেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। সংক্ষিপ্তভাবে নার্সিসিজম মানে হলো, ‘আমি অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’, এই ধরনের অতিরিক্ত আত্মমুগ্ধ ভাবনা।

এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- নিজের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা বা আত্মমুগ্ধতা, সব সময় প্রশংসা বা স্বীকৃতি চাওয়া, সমালোচনা সহ্য করতে না পারা, অন্যের অনুভূতির প্রতি সহানুভূতি না থাকা এবং নিজের সাফল্য বা ক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরা।

হাইপারথাইমিক টেম্পারামেন্ট কোন রোগ নয়। এটি একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের ধরন। এই বৈশিষ্ট্যের মধ্যে থাকে: খুব কম ঘুম (যেমন ৪ ঘণ্টা), প্রচণ্ড শক্তি ও উদ্যম, অতিরিক্ত কথা বলা, উচ্চ আত্মবিশ্বাস, দ্রুত চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া। এই ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্যের একজন মানুষ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উদ্যমী, প্রফুল্ল, আত্মবিশ্বাসী ও সক্রিয় থাকে। নেতৃত্ব দিতে পারে, মোটিভেটেড ও প্রোডাক্টিভ এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও পজিটিভ থাকতে পারে। সহজে হতাশ হয় না। তবে কখনও কখনও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে যায়। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়, অন্যদের কথা কম শোনে, বেশি কাজ নিয়ে চাপ তৈরি করতে পারে এবং রিস্কি কাজ করে ফেলতে পারে।

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর, প্রায় ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। এই ১০ বছরে ট্রাম্পের মানসিক ব্যবচ্ছেদ করেছেন অনেকেই। তার মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে লেখা হয়েছে বেশ কিছু বই। প্রকাশিত হয়েছে বহু প্রতিবেদন। আর সেগুলোর প্রায় সবগুলোতেই ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অতি সম্প্রতি, মানে গত ৭ এপ্রিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম ডেইলি বিস্ট ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘মনোবিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা: ট্রাম্পের মানসিক অবনতি দ্রুততর হচ্ছে।’ প্রতিবেদনের লেখক এরক্কি ফর্স্টার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন। প্রতিবেদনে জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনোবিজ্ঞানী ড. জন গার্টনার বলেছেন, ট্রাম্পের মধ্যে ২০১৯ সাল থেকেই ‘ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া’-এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

তার মতে, এই অবনতি এখন এত দ্রুত ঘটছে যে, চার সপ্তাহ আগের ট্রাম্প আর এখনকার ট্রাম্প এক নন।

কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, এই ধরনের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিচারবোধ হারিয়ে ফেলেন, তার আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায় এবং তিনি আগ্রাসী ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠেন।

গার্টনার ট্রাম্পের একটি ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টের উদাহরণ দেন। ট্রাম্প ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছেন, যা সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

গার্টনার দাবি করেন, এই আচরণে ‘ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া’ এবং তথাকথিত ‘ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিজমে’র মিশ্র প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

গার্টনারের ভাষায়-ট্রাম্প হয়তো ভয় সৃষ্টি ও ধ্বংসাত্মক বক্তব্য থেকে আনন্দ পাচ্ছেন। তবে তার আচরণ এখন আরও রুক্ষ ও আক্রমণাত্মক হয়েছে। তিনি আগের তুলনায় বেশি অশালীন ভাষা ব্যবহার করছেন।

তিনি আরও বলেছেন, এখন ট্রাম্প শুধু ‘মিথ্যাবাদী’ বা ‘লুজার’ শব্দ বলছেন না, বরং আরও অশালীন ভাষা ব্যবহার করছেন, যা প্রেসিডেন্টসুলভ নয় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানোর লক্ষণ হতে পারে।

এছাড়া, তিনি উল্লেখ করেন যে ট্রাম্প মাঝে মাঝেই কথা শেষ করতে পারেন না। তাকে বিভ্রান্ত দেখায়। প্রায়ই তিনি অস্বাভাবিক চিন্তার ধারা প্রদর্শন করেন।

আরেক চিকিৎসক ড. ভিন গুপ্তাও বলেন, ট্রাম্পের আচরণে ডিমেনশিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যেমন: বিভ্রান্তি, অসংলগ্ন চিন্তা এবং শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা।

তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের পরিবারে বয়সজনিত ডিমেনশিয়ার ইতিহাস রয়েছে। ট্রাম্পের বাবা আলঝাইমার রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এই বিষয়টি ট্রাম্পের ভাতিজি (তার বড় ভাই ফ্রেড ট্রাম্প জুনিয়রের মেয়ে) মেরি ট্রাম্পও উল্লেখ করেছেন। মেরি বলেন, কখনও কখনও ট্রাম্পকে দেখে তার দাদার কথা মনে পড়ে।

মনোবিজ্ঞানী, লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেরি ট্রাম্প তার লেখা বই ‘টু মাচ অ্যান্ড নেভার এনাফ’-এ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার পরিবারের অভ্যন্তরীণ জীবন সম্পর্কে ব্যক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। ২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত বইটিতে তিনি ট্রাম্প পরিবারের কঠোর ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রভাব ফেলেছে তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এছাড়া ট্রাম্পের শৈশব, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানসিক গঠন এবং কেন তিনি ‘কখনোই সন্তুষ্ট নন’ এবং ‘সবসময় আরও বেশি চান’, সেই বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা করেছেন।

এছাড়া ট্রাম্পের মানসিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্বের ধরন নিয়ে আলোচিত কয়েকটি বই রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি বই হলো ‘ট্রাম্প অন দ্য কাউচ: ইনসাইড দ্য মাইন্ড অব দ্য প্রেসিডেন্ট’। মনোবিজ্ঞানী ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জাস্টিন এ. ফ্র্যাঙ্ক বইটিতে ট্রাম্পের মানসিক ও ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেছেন। লেখকের দাবি অনুযায়ী, ট্রাম্পের আচরণে উচ্চ আত্মমর্যাদা এবং নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আবেগপ্রবণতা ও অস্থিরতা এবং হঠাৎ রাগ বা অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখা যায়। বইটিতে মূলত একটি মনোবিজ্ঞানী দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রাম্পের নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া বইটিতে লেখক সতর্ক করে বলেছেন যে, এই ধরনের ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে সংকটকালে।

২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য ডেঞ্জারাস কেস অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বইটি। ২৭ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়ে লেখা বইটিতে ট্রাম্পের আচরণ এবং তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বইয়ে তার নার্সিসিস্টিক এবং অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের লক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। বইটির সম্পাদক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশিক্ষিত ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী ব্যান্ডি এক্স. লি।

পরে ২০২৫ সালে বইটির নতুন ও সম্প্রসারিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য মাচ মোর ডেঞ্জারাস কেস অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’  নামে। বইটিতে ৫০ জন মনোবিজ্ঞানী ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞের মতামত তুলে ধরা হয়েছে। ট্রাম্পের আচরণ, ভাষা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের ধরনকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বইটিতে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্পের আচরণ এবং নেতৃত্বের ধরন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে যুদ্ধ, পররাষ্ট্রনীতি এবং সামাজিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া বইয়ে আলোচিত হয়েছে কীভাবে মানসিক বৈশিষ্ট্য ও আচরণ রাষ্ট্রনেতার সিদ্ধান্ত ও বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে এসব বই বা প্রতিবেদনগুলো প্রকাশিত হয়েছে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে। কোথাও তার ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস প্রকাশিত হয়নি। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে যখন ট্রাম্পের আচরণ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছিল, তারপর ২০১৮ সালে তিনি একবার ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিক্যাল সেন্টারে সাধারণ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান।

তবে মেরি ট্রাম্প তার বইটিতে উল্লেখ করেছেন যে, তার পরিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে আগ্রহী মনে হয়নি। ট্রাম্প নিজেও কখনও পারিবারিক বা ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ গ্রহণ করেননি।

তারপরও কি ট্রাম্পকে মানসিকভাবে সুস্থ বলা যায়? যুদ্ধ শুরুর পর গত ২১ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ট্রাম্প একাধিকবার ইরানকে হুমকি দিয়েছেন। তার সর্বশেষ হুমকি ছিল, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ খুলে না দেয়, তবে ইরানকে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। আর এর জন্য তিনি ইরানকে বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সময়সীমাও বেধে দিয়েছিলেন। কিন্তু সকালে দেখা গেলো ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছেন। তাও ইরানের শর্তগুলো মেনে নিয়ে।