কিশোরদের ‘কিশোর’ হওয়া কি অপরাধ?

যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু হয়েছে। কিন্তু এই ছুটিতে বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে আড্ডা দেওয়ার মতো কোনও উন্মুক্ত স্থান খুঁজে পাচ্ছে না দেশটির কিশোর-কিশোরীরা। উল্টো জনসমক্ষে তাদের উপস্থিতিই যেন এখন এক বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও তরুণ গবেষকদের মতে, শপিং মল, কম খরচে আড্ডা দেওয়ার জায়গা এবং বন্ধুভাবাপন্ন পাবলিক স্পেস কমে যাওয়ার কারণে কিশোরদের সামনে এখন আড্ডা দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বিশেষ করে যাদের পকেটে বেশি টাকা নেই কিংবা নিজেদের গাড়ি নেই, তারা পড়েছে চরম বিপাকে। কোথাও যাওয়ার জায়গা না পেয়ে দেশের বিভিন্ন শহরের কিশোরেরা বড় বড় জমায়েত তৈরি করছে, যাকে স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন ‘টিন টেকওভার’।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু শহরে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করা হয়েছে, যদিও গবেষণায় দেখা গেছে এটি কার্যকর নয়। আবার কিছু জায়গায় ‘অভিভাবক ছাড়া নাবালক প্রবেশ নিষেধ’ নীতি কার্যকর করা হয়েছে। কিশোর অধিকারকর্মীদের মতে, গুটিকয়েক তরুণের আচরণের জন্য সব তরুণকে এভাবে শাস্তি দেওয়া অন্যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার হাইস্কুলের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী অয়ন চৌধুরী জানায়, সে কখনও ‘টিন টেকওভারে’ যায়নি। তবে সে বন্ধুদের নিয়ে স্থানীয় পিকলবল কোর্টে সময় কাটায়। অয়ন বলে, আমরা যখন খেলি, বড়রা প্রায়ই আমাদের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে আমরা শপিং মলে কিছু খেতে যাই, কিন্তু সেটা একঘেয়ে। সেখানে করার মতো বেশি কিছু নেই। ঘুরেফিরে একই খাবারের দোকান আর বেশির ভাগ সময় আমরা কিছু না কিনে উইন্ডো শপিং করি। তখন মনে হয়, মলে আসলে কী করতে এসেছি?

বাস্তবতা হলো, অনেক পাবলিক স্পেস কিশোরদের উপযোগী করে তৈরিই করা হয়নি, এমনকি কিছু জায়গা এমনভাবে বানানো হয়েছে যাতে তারা সেখানে আসতে না পারে। ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার বিশেষজ্ঞ প্যাটসি ইউব্যাঙ্কস ওয়েন্স বলেন, ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি যখন তিনি এই বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন, তখন এ সংক্রান্ত তথ্য খুব কম ছিল। পরে তিনি ভবন নকশাকারীদের ওপর জরিপ চালান।

ওয়েন্স বলেন, সেই জরিপের প্রতিক্রিয়া ছিল চোখ খোলার মতো। তারা বলেছিলেন যে, আসলে আমাদের এমনভাবে ডিজাইন করতে বলা হয়েছে যাতে কিশোরেরা সেই জায়গাগুলো থেকে দূরে থাকে। এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে।

ফৌজদারি বিচার বিষয়ের অধ্যাপক জেফরি বাটসের মতে, অস্পষ্ট উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি বিরোধী আইনের কারণে পুলিশ এক ধরণের খোলামেলা সুযোগ পেয়ে যায় কিশোরদের কেবল ‘কিশোর হওয়ার অপরাধে’ তদন্ত করার। বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকাকে কে দাঁড়াচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। বাটসের মন্তব্য, ‘এটি আমেরিকা। এখানে সব সময়ই বর্ণ বৈষম্য থাকবে, কারণ জননিরাপত্তা রক্ষার জন্য তৈরি সরকারি ব্যবস্থাগুলো বর্ণবাদী মানসিকতায় রঞ্জিত।’

আগের প্রজন্মের মানুষেরা ঘর, স্কুল বা কর্মস্থলের বাইরে আড্ডা দেওয়ার যে থার্ড প্লেস বা বিকল্প স্থানটি খুব সহজে পেতেন, বর্তমানের কিশোরেরা তা থেকে বঞ্চিত। প্রজেক্ট ফর পাবলিক স্পেস-এর সহ-নির্বাহী পরিচালক নেট স্টোরিং বলেন, গত এক বছর ধরে আমরা ‘থার্ড প্লেস’ নিয়ে গণমাধ্যমের অনেক প্রশ্ন পাচ্ছি, যার বেশির ভাগই আসছে শিক্ষার্থীদের নিজেদের পত্রিকা থেকে। কিশোরেরা বুঝতে পারছে যে তারা একাকীত্বে ভুগছে। তারা নিজেরা গবেষণা করে জানতে পেরেছে ‘থার্ড প্লেস’ কী এবং ভাবছে, ‘আহা, আমাদের কমিউনিটিতে এমন একটা জায়গা নেই কেন?’

এই সমস্যার সমাধানও দেখিয়েছে স্টোরিংয়ের সংস্থাটি। তারা তরুণদের সঙ্গে নিয়ে সান আন্তোনিওতে ‘দ্য পাস’ নামের একটি পাতাল পথকে নতুন রূপ দিয়েছে। সেখানে বাস্কেটবল কোর্ট, চার্জিং স্টেশন এবং বসার জায়গা করা হয়েছে। স্টোরিং জানান, জায়গাটিকে প্রাণবন্ত করার মূল চাবিকাঠি ছিল কিশোরদের ওপরই এর মূল্যায়ন ও পরিবর্তনের দায়িত্ব দেওয়া।

স্টোরিং বলেন, কিশোরদের সঙ্গে ‘আমরা বনাম ওরা’ এমন আচরণ বন্ধ করুন। তাদের এমন মানুষ হিসেবে গণ্য করুন যাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা আছে। তাদের কথা শুনুন এবং কীভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় তা নিয়ে ভালো মন নিয়ে আলোচনা করুন, কারণ ওরাই সমস্যার সমাধান হতে পারে।

সূত্র: অ্যাক্সিওস