রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকছেন মার্কিনিরা

গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে মার্কিন নাগরিকদের নৈতিক মূল্যবোধে একধরনের রক্ষণশীল প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক নতুন জরিপ অনুযায়ী, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার, বিবাহবহির্ভূত সন্তান জন্মদান এবং জুয়া খেলাকে নৈতিকভাবে সঠিক মনে করেন, এমন মার্কিনিদের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় এবার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়ে আমেরিকানদের এই রক্ষণশীল মনোভাব এমন এক সময়ে দৃশ্যমান হচ্ছে, যার সঙ্গে দেশটিতে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক পুনরুত্থান, তরুণদের মাঝে ধর্মীয় অনুভূতির প্রত্যাবর্তন এবং এলজিবিটিকিউ প্লাস অধিকারের অগ্রগতির বিরুদ্ধে রক্ষণশীলদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার যোগসূত্র রয়েছে।

জরিপের তথ্য বলছে, এখনও আমেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জন্মনিয়ন্ত্রণ, বিবাহবহির্ভূত সন্তান এবং জুয়া খেলাকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন। তবে তা সত্ত্বেও গত বছরের তুলনায় এই হার এবার অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।

গ্যালপ-এর ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া জরিপের ইতিহাসে এবারই প্রথম জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করা মার্কিনিদের সংখ্যা সবচেয়ে নিচে নেমে গেছে। গত বছর এই হার যেখানে ৯০ শতাংশ ছিল, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশে।

২০০০ ও ২০১০ সালের শুরুর দিকে বিবাহবহির্ভূত সন্তান ধারণের বিষয়টি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করা মানুষের সংখ্যা বেশ কম ছিল। পরবর্তীতে ২০২২ ও ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান জরিপে সেই সংখ্যা আবার কমে ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

গ্যালপ-এর সিনিয়র এডিটর মেগান ব্রেনান জানান, জন্মনিয়ন্ত্রণ ও বিবাহবহির্ভূত সন্তান ধারণের মতো বিষয়গুলোতে মার্কিনিদের এই বড় ধরনের মানসিক পরিবর্তনের পেছনে মূলত দেশটির রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র নাগরিকদের মতামতের বড় ভূমিকা রয়েছে।

মেগান ব্রেনানের মতে, এই পরিসংখ্যানটি হয়তো ইঙ্গিত করছে যে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অতিরিক্ত উদারপন্থি আদর্শ থেকে দূরে সরে এসে মধ্যপন্থার দিকে ঝুঁকছে। অথবা, হতে পারে এটি নতুন কোনও বড় পরিবর্তনের প্রকৃত সূচনা।

জন্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জুয়া খেলাকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করার হারও মার্কিনিদের মাঝে এবার সর্বনিম্ন স্তরে ঠেকেছে। এমন এক সময়ে এই অনীহা দেখা গেলো, যখন দেশটিতে সংবাদ, খেলাধুলা, ব্যবসা ও রাজনীতি নিয়ে বাজি ধরার জনপ্রিয় অথচ বিতর্কিত মাধ্যম প্রেডিকশন মার্কেট বেশ জমজমাট।

চলতি বছরের শুরুতে ইপসোস এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর বয়েজ অ্যান্ড মেন-এর যৌথ জরিপ থেকে জানা গেছে, মার্কিনিরা এই প্রেডিকশন মার্কেটে লেনদেন করাকে বিনিয়োগের চেয়ে জুয়া হিসেবেই বেশি বিবেচনা করেন।

গ্যালপ মানুষের বিভিন্ন আচরণ ও অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে এই জরিপটি পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে আটটি বিষয়কে আমেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নৈতিকভাবে অনৈতিক বলে মনে করেন। বিষয়গুলো হলো, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক, পরকীয়া, মানব ক্লোনিং, বহুবিবাহ, আত্মহত্যা, প্রাণী ক্লোনিং, পর্নোগ্রাফি এবং নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন।

জরিপে দেখা গেছে, নিজের লিঙ্গ পরিবর্তনকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করা মানুষের সংখ্যা যেমন কমছে, তেমনি সমকামী বিয়ে ও সমকামী সম্পর্কের বৈধতা বা নৈতিকতার প্রতি মার্কিনিদের সমর্থনও আগের চেয়ে কিছুটা ম্লান হচ্ছে।

জরিপের কিছু প্রশ্নে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে স্পষ্ট দলীয় বিভাজন লক্ষ করা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ডেমোক্র্যাট সমর্থকেরা গর্ভপাত ও লিঙ্গ পরিবর্তনকে নৈতিকভাবে সঠিক মনে করার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা মৃত্যুদণ্ড, পশুর চামড়া বা পশমের তৈরি পোশাক কেনা ও পরা এবং প্রাণীদের ওপর চিকিৎসাসংক্রান্ত পরীক্ষার পক্ষে অনেক বেশি সমর্থন দিয়েছেন। তবে মানুষ ও প্রাণী ক্লোনিংয়ের মতো কিছু বিষয়ে দুই দলের সমর্থকেরাই নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।

চলতি বছরের ১ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাসকারী ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ১,০০১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর দৈবচয়ন নমুনার ভিত্তিতে টেলিফোনে এই জরিপটি চালানো হয়।

সূত্র: অ্যাক্সিওস