ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে নিজের ক্ষমতার ‘কোনও সীমা’ তিনি খুঁজে পাননি বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার দ্য অ্যাক্সিওস শো-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই ঘোষণা দেন। শুধু তা-ই নয়, আগামী সপ্তাহে প্রকাশ পেতে যাওয়া একটি বইয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ট্রাম্প নিজেকে ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ হিসেবে মনে করছেন এবং এই ধারণা তিনি বেশ উপভোগও করছেন।
ট্রাম্প এখন আর কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদের ক্ষমতার সীমানা পরীক্ষা করছেন না, বরং তিনি নিজের ক্ষমতাকে বিশ্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখছেন। তিনি নিজেকে আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান বা নেপোলিয়নের মতো বিশ্বজয়ী ও একনায়কদের কাতারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন, যারা একসময় পুরো বিশ্বকে নিজেদের ইচ্ছামতো পরিচালনা করেছিলেন।
অ্যাক্সিওসের মার্ক ক্যাপুটোকে দেওয়া ৪৫ মিনিটের এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, অন্য সবার আত্মসমর্পণই তার ক্ষমতার মাপকাঠি। তিনি দাবি করেন, জি-৭ নেতারা তার এই রসিকতা বিশ্বাস করেছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন ‘আমিই বস’। পাশাপাশি ইসরায়েলও তাকে ‘প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করে’ এবং ‘আমি যা বলব, তারা তা-ই করবে’।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান এবং জোনাথন সোয়ানের লেখা ‘রেজিম চেঞ্জ’ বইটি আগামী মঙ্গলবার বাজারে আসছে। এই বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে এমন একটি নথি দেখিয়েছেন যেখানে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, তিনি আতিল্লা দ্য হুন, চেঙ্গিস খান, নেপোলিয়ন, স্টালিন, মাও সেতুং এবং হিটলারের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর।
লেখকেরা জানিয়েছেন, ট্রাম্প নিজেই সেই নথি থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নাম পড়ে শোনান এবং ব্যাখ্যা করেন কীভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ক্ষমতার কাছে এই ঐতিহাসিক চরিত্ররা ‘নস্যি’ ছিলেন। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, সিজার কিংবা উইলিয়াম দ্য কনকারার সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘ওদের তো কোনও উড়োজাহাজ ছিল না, তাই না? চাইলেই তো সব জায়গায় ভ্রমণ করা যেত না।’ লেখকদের মতে, নেপোলিয়নের নাম নেওয়ার সময় ট্রাম্পের মুখে এক ধরনের পরম তৃপ্তি প্রকাশ পাচ্ছিলো।
হ্যাবারম্যান ও সোয়ান লিখেছেন, এই ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল যে, মাও সেতুং, হিটলার এবং স্ট্যালিনের মতো স্বৈরাচারীদের তালিকায় নিজের নাম দেখে ট্রাম্পের স্পষ্ট আনন্দ প্রকাশ এবং অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে নিজেকে এমন মানুষদের কাতারে মেনে নেওয়া, যারা ভয় ও বিজয়ের মাধ্যমে পৃথিবীকে পুনর্গঠন করেছিলেন।
ফ্রান্সে একটি ‘প্রভাবশালী’ জি-৭ সম্মেলন শেষ করে ফেরার কয়েক ঘণ্টা পর দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের এই আকাশচুম্বী ক্ষমতা তত্ত্বের আভাস বারবার পাওয়া গেছে। ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তার সবচেয়ে পছন্দের বিশ্বনেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি শি জিনপিংয়ের কাজের প্রতি একাগ্রতা এবং মোদিকে একজন ‘অত্যন্ত শক্ত মনের মানুষ’ হিসেবে প্রশংসা করেন।
সবচেয়ে দুর্বল নেতাদের নাম বলতে অস্বীকৃতি জানালেও ট্রাম্প জি-৭-এ ভ্লাদিমির পুতিনের অনুপস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ করেন। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর রাশিয়াকে এই জোট (তৎকালীন জি-৮) থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ভার্সাই প্রাসাদে তাকে যে রাজকীয় নৈশভোজের সম্মান দিয়েছিলেন, সেই আভিজাত্যকে নিজের ‘দুর্বলতা’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের ভাষায়, মিত্ররা কেবল তখনই প্রাসঙ্গিক যখন তারা বুঝতে পারে যে আসল ক্ষমতার অধিকারী কে। ইসরায়েল প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি না থাকলে আজ ইসরায়েলের কোনও অস্তিত্ব থাকত না’। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সম্পর্ক ‘ভালো, তবে আমাদের তাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে’।
ইরান চুক্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ নিজের দলের রিপাবলিকান কট্টরপন্থিদেরও একহাত নিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আগে আমি যাদের সম্মান করতাম, এখন আর তাদের করি না। ওরা সব কট্টরপন্থি।’ চুক্তিটি কেন তার আগের দাবি অনুযায়ী পুরোপুরি কঠোর হলো না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প নিজের তৈরি করা বাস্তবতাকেই সামনে এনে দাবি করেন, এই চুক্তির ফলাফল আসলে ইরানের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’ এবং সেখানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’।
সীমাহীন ক্ষমতার দাবি করলেও ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে একটি শক্তি এখনও তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা হলো ‘অর্থনীতি’। তিনি যুক্তি দেন, কট্টরপন্থিদের সন্তুষ্ট করতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করলে তা বিশ্বব্যাপী ‘মহামন্দা’ ডেকে আনতে পারত। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া এবং শেয়ারবাজারের রেকর্ড উত্থানই প্রমাণ করে যে ইরান চুক্তিকে সমর্থন দিয়ে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার একটিই প্রাথমিক ইচ্ছা... আমি কখনোই প্রয়াত এবং মহান হারবার্ট হুভার হতে চাই না।’ উল্লেখ্য, হুভার ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৩১তম প্রেসিডেন্ট, যার নাম বিশ্বব্যাপী মহামন্দার সঙ্গে চিরকাল জড়িয়ে আছে।
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ এই ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সম্পর্কিত নথিটি পোস্ট করেন এবং এর লেখককে একজন ইতিহাসবিদ বলে দাবি করেন।
তবে সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান এবং জোনাথন সোয়ান তাদের বইয়ে আসল সত্য ফাঁস করে দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, ওই নথির লেখক আসলে কোনও ইতিহাসবিদ নন, বরং বিখ্যাত গলফার গ্যারি প্লেয়ারের গলফ ব্যাগ বহনকারী এবং ব্যক্তিগত বিশ্বস্ত বন্ধু!
সেই গলফ সহকারীর তৈরি করা নথির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল: বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজের ক্ষমতা ব্যবহারের যে সাহস ট্রাম্প দেখিয়েছেন, তা তাকে ‘এই গ্রহে এযাবৎকালের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত করেছে’।