লাতিন আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও এর আশপাশের এলাকা। ধসে পড়া শত শত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধার এবং নিখোঁজ হাজারো মানুষের সন্ধানে শুক্রবার উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত ২৩৫ জনের মরদেহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। তবে বুধবার কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে আঘাত হানা ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার এই ভূমিকম্পে মোট হতাহতের কোনও আনুষ্ঠানিক হিসাব এখনও সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।
দেশটির বিরোধীদলীয় নেতাদের শেয়ার করা নিখোঁজ ব্যক্তিদের ট্র্যাকিং বিষয়ক একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪৯ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের তিন নাগরিক নিহত হয়েছেন, চারজন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন এবং আরও ৯৯ জনের কোনও সন্ধান মিলছে না।
বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো পৌঁছানোর পর ফায়ার সার্ভিস, সেনা সদস্য এবং উদ্বিগ্ন নাগরিকেরা বিধ্বস্ত ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছেন। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অনেক এলাকায় তারা খালি হাতে এবং টর্চলাইট জ্বালিয়ে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন।
কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত এই দেশটির লাখ লাখ মানুষ আগেই দরিদ্র হয়ে পড়েছেন, অনেকে দেশ ছেড়েছেন এবং ভেঙে পড়েছে মৌলিক অবকাঠামো ও নাগরিক সেবা। এমন পরিস্থিতিতে এই ভূমিকম্পের ফলে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন, যাদের অনেকেই পাহাড়ের ঢালে ব্যারিওস নামের ভঙ্গুর বস্তিতে বসবাস করতেন।
সরকারি তথ্যমতে, অন্তত ২৫০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্তত আটটি হাসপাতাল, ভেনেজুয়েলান রেড ক্রস এবং ফরাসি দূতাবাস ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। সংস্থাটি জরুরি আশ্রয় ও অন্যান্য ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহ করছে। কারাকাসের সংলগ্ন উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি কারাবোবো রাজ্যের উপকূলীয় শহর মোরোনে অসংখ্য ঘরবাড়ি দুমড়েমুচড়ে গেছে। বাসিন্দাদের কাছে কোনও পানি বা বিদ্যুৎ নেই। পরিবারগুলো তোশক, টেলিভিশন এবং ওয়াশিং মেশিনসহ যা পারছে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছে।
প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লা গুয়াইরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মেক্সিকান সেনা ও অনুসন্ধানী কুকুর পৌঁছানোর ভিডিও পোস্ট করেছেন। বিমানবন্দরটি বর্তমানে কেবল সরকারি ও সামরিক ফ্লাইটের জন্য খোলা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মারাকাই এবং ভ্যালেন্সিয়া শহরের বিমানবন্দর দিয়েও অন্যান্য দেশের ত্রাণ আসছে।
জাতিসংঘের ত্রাণ প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, সংস্থাটি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর কাজ সমন্বয় করছে। ভূমিকম্পের আগেই যেখানে ৮০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল, সেখানে এখন একটি বিশাল সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন হবে।
এদিকে স্পেসএক্স-এর স্টারলিংক জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নতুন ও পুরোনো গ্রাহকদের জন্য আগামী ২৫ জুলাই পর্যন্ত তারা বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে টার্মিনাল স্থাপনের কাজ করছে।