গোল হলেই বাজবে কোন গান, কীভাবে ঠিক হয় বিশ্বকাপের প্লে-লিস্ট?

বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ চলাকালীন বা খেলা শেষে গ্যালারিতে যখন ‘ওয়ান্ডারওয়াল’, ‘সুইট ক্যারোলিন’ কিংবা ‘ফ্রিড ফ্রম ডিজায়ার’-এর মতো জনপ্রিয় গানগুলো বেজে ওঠে, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই গানগুলো কি এমনি এমনি বাজানো হয়? ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা জানাচ্ছে, বিষয়টি মোটেও আকস্মিক নয়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে যেখানে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে, সেখানে মাঠের আবহ জমিয়ে রাখতে সাড়ে সাতশোরও বেশি গান আগে থেকেই নির্বাচন করে রাখা হয়েছে।

ফিফার একটি নির্দিষ্ট স্টেডিয়াম এন্টারটেইনমেন্ট টিম অংশ নেওয়া প্রতিটি দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনা করে এই প্লে-লিস্ট তৈরি করে। প্রতিটি দলের জন্য লাইন-আপ ঘোষণার সময় একটি নির্দিষ্ট ‘সিগনেচার’ গান, গা-গরমের (ওয়ার্ম-আপ) জন্য একটি গান এবং গোল দেওয়ার পর বাজানোর জন্য একটি বিশেষ ট্র্যাক নির্ধারিত থাকে।

‘উই লুজ এভরি উইক: দ্য হিস্ট্রি অব ফুটবল চ্যান্টিং’-এর লেখক অ্যান্ড্রু লন বলেন, গানগুলোকে অবশ্যই আকর্ষণীয়, আবেগী ও পরিচিত হতে হয়। কোনও সফল মুহূর্তের সঙ্গে যখন একটি গান জড়িয়ে যায়, তখন মানুষের আবেগও তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে আটকে যায়। যেমন কোভিড-১৯ লকডাউনের দীর্ঘ একাকীত্ব শেষে গ্যালারিতে ফেরা ইংল্যান্ডের সমর্থকেরা যখন নেইল ডায়মন্ডের ‘সুইট ক্যারোলিন’ গানের হাত ছোঁয়ার লিরিকগুলো গেয়ে ওঠেন, তখন তা এক ভিন্ন মাত্রা পায়।

কিছু গান বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার কারণে একাধিক দেশের তালিকায় রয়েছে; যেমন দ্য হোয়াইট স্ট্রাইপসের ‘সেভেন নেশন আর্মি’ কিংবা এসি/ডিসি-র ‘থান্ডারস্ট্রাক’। তবে অনেক দেশ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির গান বেছে নিয়েছে। আর্জেন্টিনা তাদের ওয়ার্ম-আপ ও গোল উদযাপনের জন্য বেছে নিয়েছে লস ফ্যাবুলোসোস ক্যাডিলাকসের রেগে-প্রভাবিত গান ‘এল মাতাদোর’। গানটি শুনলে মনে হতে পারে এটি লিওনেল মেসির গোল করার দক্ষতা উদযাপন করছে, কিন্তু আসলে এটি ১৯৭০-এর দশকের লাতিন আমেরিকার একনায়কতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এক অন্ধকার ইতিহাস তুলে ধরে।

স্টেডিয়ামে সমর্থকদের একাংশ। ছবি: এপি

অন্যান্য দেশের মধ্যে ঘানার সিগনেচার ও গোল টিউন হলো ডোপনেশনের ২০২৫ সালের জনপ্রিয় ড্যান্স ট্র্যাক ‘কাকালিকা’। মেক্সিকো বেছে নিয়েছে ১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মারিয়াচি ফোক ব্যান্ড মারিয়াচি ভার্গাস-এর তিনটি গান। দক্ষিণ কোরিয়া তাদের তালিকায় রেখেছে ব্ল্যাকপিঙ্ক ও বিটিএস-এর মতো জনপ্রিয় কে-পপ ট্র্যাক। কিলিয়ান এমবাপ্পে ফ্রান্সের হয়ে গোল করলেই স্টেডিয়ামে বেজে ওঠে ডাফ্ট পাঙ্কের ‘ওয়ান মোর টাইম’। অস্ট্রেলিয়ার সিগনেচার গান মেন অ্যাট ওয়ার্কের ‘ডাউন আন্ডার’ এবং বেলজিয়ামের ওয়ার্ম-আপ ট্র্যাক টেকনোট্রনিকের ‘পাম্প আপ দ্য জ্যাম’।

টুর্নামেন্ট চলাকালীন দর্শকের প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে অনেক সময় গান পরিবর্তনও হয়। যেমন প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারানোর পর ইংল্যান্ডের গ্যালারিতে ওয়েসিস ব্যান্ডের ‘ওয়ান্ডারওয়াল’ গানটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। অধিনায়ক হ্যারি কেন এক সাক্ষাৎকারে একে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত উল্লেখ করে বলেন, স্টেডিয়ামে সবার একসঙ্গে সেই গান গাওয়ার দৃশ্যটি ছিল সত্যিই দারুণ। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ইউএসএ! ইউএসএ!’ স্লোগান নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়া মার্কিন সমর্থকেরা এখন জন ডেনভারের ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস’ গানটি আপন করে নিয়েছেন। বিশ্লেষক লন মনে করেন, আমেরিকার ফুটবল সংস্কৃতি এখনও নতুন হওয়ায় এটি কিছুটা কৃত্রিম মনে হতে পারে, তবে আগামী ৩০ বছর ধরে এটি গাওয়া হলে এটিই একসময় তাদের খাঁটি ফুটবল ঐতিহ্যে পরিণত হবে।

সূত্র: রয়টার্স