প্যারাসুট নিয়ে উড়োজাহাজ থেকে উধাও ছিনতাইকারী, চার দশক পরও অধরা যে রহস্য

১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর বিকালের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনের পোর্টল্যান্ডে নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে এসে দাঁড়ান শান্ত ও সাধারণ চেহারার এক লোক। নিজের পরিচয় দেন ড্যান কুপার নামে। সিয়াটলে যাওয়ার ফ্লাইট ৩০৫-এর একটি একমুখী টিকিট নগদ অর্থ দিয়ে কেনেন তিনি। পরনে সুতি বিজনেস স্যুট, সাদা শার্ট আর কালো টাই। বয়স চল্লিশের মাঝামাঝি। উড্ডয়নের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় বারবন ও সোডার একটি পানীয় অর্ডার করেন তিনি। কিন্তু কে জানত, এই সাধারণ চেহারার মানুষটির মাধ্যমেই সূচিত হতে যাচ্ছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের ইতিহাসের অন্যতম বড় এক অমীমাংসিত রহস্য।

বিকাল ৩টার কিছু সময় পর তিনি এক বিমানবালাকে ডেকে একটি নোট বাড়িয়ে দেন। তাতে লেখা ছিল, তার ব্রিফকেসে বোমা রয়েছে এবং বিমানবালাকে তার পাশে বসতে হবে। স্তম্ভিত বিমানবালা কুপারের পাশে বসলে তিনি সস্তা অ্যাটাচি কেসটি সামান্য খুলে ভেতরে একগুচ্ছ তার ও লাল রঙের কাঠি দেখান। নির্দেশ দেন কথাগুলো লিখে নিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাপ্টেনের হাতে পৌঁছায় বিমানবালার নতুন নোট। তাতে দাবি ছিল, চারটি প্যারাসুট এবং ২০ ডলারের নোটে মোট ২ লাখ ডলার মুক্তিপণ।

সিয়াটলে বিমানটি অবতরণ করার পর কুপার মুক্তিপণ ও প্যারাসুটের বিনিময়ে ৩৬ জন যাত্রীকে মুক্ত করে দেন। তবে কয়েকজন ক্রু সদস্যকে জিম্মি রেখে বিমানটিকে মেক্সিকো সিটির উদ্দেশে উড্ডয়নের নির্দেশ দেন। সিয়াটল ও রেনোর মাঝামাঝি কোনও এক জায়গায় রাত ৮টার কিছু সময় পর ঘটে সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। একটি প্যারাসুট ও মুক্তিপণের অর্থ নিয়ে বিমানের পেছনের অংশ দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে ঝাঁপ দেন কুপার। পাইলটরা বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করাতে পারলেও রাতের আঁধারে চিরতরে মিলিয়ে যান তিনি।

ঘটনাটি জানতে পেরে এফবিআই অবিলম্বে নরজ্যাক নামে এক বিশাল তদন্ত শুরু করে। তল্লাশি চালানো হয় বিমানে, শত শত মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পাঁচ বছরের মধ্যে গোয়েন্দারা ৮০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজনকে তালিকায় আনেন, যার প্রায় সবই পরে বাদ পড়ে।

তদন্তে বিমান থেকে পাওয়া যায় কুপারের ফেলে যাওয়া কালো জে. সি. পেনি টাই, যেখান থেকে পরে ডিএনএ নমুনা সংগৃহীত হয়। এ ছাড়া কুপারের রেখে যাওয়া দুটি প্যারাসুট ও একটি ক্যানভাসের ব্যাগ উদ্ধার হয়। তিনি দুটি প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়েছিলেন, যার একটি ছিল শুধু প্রদর্শনী ও নির্দেশনার জন্য সেলাই করে বন্ধ করা এবং অন্য একটির দড়ি দিয়ে তিনি টাকার ব্যাগটি বেঁধেছিলেন।

ঘটনার পাঁচ মাসের কম সময়ের মধ্যে রিচার্ড ফ্লয়েড ম্যাককয় নামে এক ব্যক্তিকে একই কায়দায় বিমান ছিনতাই ও প্যারাসুটে পালানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তবে দুই বিমানবালার দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে অমিল থাকায় তাকেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

তদন্তকারীদের অনেকের ধারণা, কুপার হয়তো সেই বিপজ্জনক লাফের পর জীবিতই ছিলেন না। কারণ তার ব্যবহৃত প্যারাসুটটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল না, পোশাক ও জুতো ছিল বনাঞ্চলের অনুপযোগী এবং অন্ধকারের মধ্যে গভীর জঙ্গলে ঝাঁপ দেওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৮০ সালে এক বালক কলম্বিয়া নদীর কাছে ২০ ডলারের নোটে ভর্তি পচে যাওয়া ৫ হাজার ৮০০ ডলারের একটি প্যাকেট পায়, যার সিরিয়াল নম্বর মুক্তিপণের টাকার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এই ঘটনা কুপারের মৃত্যুর তত্ত্বকে আরও জোরালো করে।

সংবাদমাধ্যমে ‘ডি. বি. কুপার’ নামটি ছড়িয়ে পড়লেও তা ছিল মূলত একটি ভুল ধারণা। পুলিশ ‘ডি. বি.’ আদ্যক্ষরের এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, যিনি মূল ছিনতাইকারী ছিলেন না।

দীর্ঘ চার দশক ধরে চেষ্টা চালিয়েও কোনও সুরাহা না পেয়ে ২০১৬ সালের ১২ জুলাই এফবিআই জানায়, তারা এই কেসের বরাদ্দকৃত সম্পদ অন্য কাজে সরিয়ে নিয়েছে। এর মাধ্যমে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক ও রহস্যময় এই বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাটি আজও অমীমাংসিতই থেকে গেলো।

সূত্র: এফবিআই