নির্বচনে যে দলই জিতুক, নিউজিল্যান্ডের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী ‘ক্রিস’

নিউজিল্যান্ডে নতুন সরকার বেছে নিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শনিবার শেষ হবে ভোটগ্রহণ। তবে নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী যে ‘ক্রিস’ নামের একজন পুরুষ হচ্ছেন, তা প্রায় নিশ্চিত। কারণ, দেশটির সবচেয়ে বড় দুই রাজনৈতিক দলের নেতার নামই ক্রিস।

মধ্য-ডানপন্থি ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুক্সন। ২০২৩ সালের নির্বাচনে মধ্য-বামপন্থি লেবার পার্টিকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসে তার দল। লেবার পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন ক্রিস হিপকিন্স।

‘দুই ক্রিসের লড়াই’ নামে পরিচিত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুই নেতাই ভোটারদের কাছে বেশ অজনপ্রিয়। অন্তত অধিকাংশ জনমত জরিপে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। নিউজিল্যান্ডে রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রিস নামের নেতাদের আধিপত্যের পেছনে রয়েছে দেশটিতে ক্রিস্টোফার নামের জনপ্রিয়তার ইতিহাস। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নবজাতকদের মধ্যে নামটি বেশ প্রচলিত ছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে প্রায় ৮০০ শিশুর নাম রাখা হয়েছিল ক্রিস্টোফার। তবে ২০২৫ সালে এই নামে জন্ম নিয়েছে মাত্র ২০ শিশু।

অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসেন লুক্সন

ন্যাশনাল পার্টির নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লুক্সনের বয়স ৫৬ বছর। ১৯৭০ সালে নিউজিল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ৬০০-এর বেশি ক্রিস্টোফারের একজন তিনি। ২০২৩ সালের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে রাজনীতিতে তিনি ছিলেন তুলনামূলক নতুন মুখ। ২০২০ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

রাজনীতিতে আসার আগে দেশটির জাতীয় বিমান সংস্থা এয়ার নিউজিল্যান্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন লুক্সন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভারের নির্বাহী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

দুই সন্তানের বাবা লুক্সন নিজের খ্রিষ্টীয় ধর্মবিশ্বাস নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে প্রায়ই অনীহা দেখান। নিউজিল্যান্ড মূলত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হওয়ায় সেখানে রাজনীতিবিদদের দৃঢ় ধর্মীয় বিশ্বাসকে কখনো কখনো সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল তার দল। বিদেশে বিভিন্ন চুক্তি করার ক্ষেত্রে নিজের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন লুক্সন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের অর্জনের তালিকায় ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, রফতানি বৃদ্ধি, শিক্ষা সংস্কার এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

২০২৬ সালে জনমত জরিপে সমর্থন কমে যাওয়া এবং বক্তব্যে কয়েকটি ভুলের পর দলের আইনপ্রণেতাদের আস্থা ভোটের মুখে পড়েন লুক্সন। তার নেতৃত্ব নিয়ে অস্বাভাবিকভাবে দুটি আস্থা ভোট অনুষ্ঠিত হয়। দলের নেতৃত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার জল্পনা বাড়লে একটি ভোটের উদ্যোগ নিজেই নিয়েছিলেন তিনি।

দ্বিতীয় আস্থা ভোটের পেছনে ছিলেন আরেক ক্রিস, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস পেনক। নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর লুক্সন তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেন। নির্বাচনের পর রাজনীতি ছাড়বেন পেনক। এদিকে লুক্সনের মন্ত্রিসভার তৃতীয় শীর্ষ নেতা পরিবহনমন্ত্রী ক্রিস বিশপকে দলের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রায়ই আলোচনায় আনা হয়।

দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ খুঁজছেন হিপকিন্স

লেবার পার্টির নেতা হিপকিন্সের বয়স ৪৮ বছর। ১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া তিনি চার শতাধিক শিশুর একজন, যাদের সে বছর নাম রাখা হয়েছিল ক্রিস্টোফার।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন আকস্মিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিলে সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান হিপকিন্স। পাঁচ বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর ক্লান্তির কথা জানিয়ে সরে দাঁড়িয়েছিলেন আরডার্ন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয় মাস দায়িত্ব পালনের পর নির্বাচনে লেবার পার্টির পরাজয় হয়। এরপর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব নেন হিপকিন্স। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার সময় ছাত্র সংসদের সভাপতি হিসেবে রাজনীতিতে তার যাত্রা শুরু। ৩০ বছর বয়সে ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

দুই সন্তানের বাবা হিপকিন্স আরডার্নের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং করোনা মহামারি মোকাবিলার দায়িত্বসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। নিউজিল্যান্ডের কঠোর কোভিড-১৯ লকডাউনের জনস্বাস্থ্যগত ফলাফল বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা পেলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে লেবার পার্টি। বিশেষ করে দেশটির বৃহত্তম শহর অকল্যান্ডে এর প্রভাব ছিল বেশি।

২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় কমানো এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন হিপকিন্স। তবে বিরোধীরা এখনো তাকে মহামারিকালীন নীতির সঙ্গে যুক্ত করে সমালোচনা করছে।

নিজেকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেন হিপকিন্স। আরডার্ন পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে হুডি, বেসবল ক্যাপ ও চোখজোড়া ঢাকা সানগ্লাস পরে হাজির হয়েছিলেন তিনি। সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মিমের জন্ম দেয়।

সূত্র: এপি