মূলধারার চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তুর্কিভাষী উইঘুরদের ঘরে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে হান সম্প্রদায়ের ‘গুপ্তচরদের।’ চীনের সরকারি এসব কর্মচারীরা উইঘুর পরিবারের সঙ্গে থাকেন, যাতে তাদেরকে চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহায়তা করতে এবং প্রয়োজনে সরকারকে উইঘুরদের ‘অগ্রহণযোগ্য’ জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, হান সম্প্রদায়ের ১০ লাখেরও বেশি সরকারি চাকরিজীবীকে উইঘুরদের পরিবারের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরা এখন উইঘুর পরিবারের ‘সদস্য’ হয়ে নজরদারি করছেন।
চীনের শিনজং (Xinjiang) প্রদেশের উইঘুররা দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের স্বীকার হচ্ছেন। অন্যদিকে চীন বিদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঠেকানো ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য গ্রহণ করেছে উইঘুরবিরোধী প্রকল্প। ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, শুধু ঘরের ভেতরে নয়, উইঘুরদের কবর, বিয়ের মতো অনুষ্ঠানেও হান জনগোষ্ঠীর সরকারি কর্মচারীরা উপস্থিত থাকেন। এভাবে হান সম্প্রদায়ের সদস্যদের উইঘুরদের পরিবারে জোর করে সদস্য বানিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে সরকার মিষ্টি সাংস্কৃতিক বিনিময় হিসেবে দেখলেও, উইঘুররা রাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ।
‘দ্য ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি শাখা। শিনজংয়ে প্রতিষ্ঠানটির ‘ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্ট’ গত ফেব্রুয়ারি মাসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সরকারি কর্মচারীদের নির্ধারিত পরিবারের সঙ্গে দুই মাস থাকতে হবে, সপ্তাহে টানা পাঁচদিন করে। এটি তাদের কাছে ‘পারিবারিক পুনর্মিলনী।’ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা ওই কর্মসূচিকে এখন স্থায়ী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন তাদের জন্য নির্দিষ্ট করা পরিবারের সদস্যদের যেকোনও উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন। শিশুর নাম রাখা, মুসলমানি দেওয়া, বিয়ে এবং কবর দেওয়ার মতো ঘটনাতেও তারা যেন উপস্থিত থাকেন।
পরিবারের সব সদস্যের মতাদর্শিক অবস্থান, সামাজিক কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় অবস্থান, আয় ও প্রয়োজনের তথ্য তো বটেই, এমন কি তাদের আত্মীয়-স্বজনের বিষয়েও প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হান সম্প্রদায়ের এসব ‘সরকারি আত্মীয়দের’ খাবার-দাবারের খরচ মেটাতে সরকার সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে দিনে দুই দশমিক আট ডলার থেকে শুরু করে সাত দশমিক আট ডলার পর্যন্ত বিশেষ ভাতা দেয়। কোনও কোনও পরিবারে তিন জন পর্যন্ত ‘সরকারি হান আত্মীয়কে’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তুরস্কে বসবাস করা উইঘুররা মন্তব্য করেছেন, চীনা সরকারের প্রত্যাশা উইঘুররা হানদের মতো ধর্মনিরপেক্ষ জীবনযাপন করবে। হঠাৎ করে ধূমপান-মদ্যপান ছেড়ে দেওয়া, ‘অস্বাভাবিক’ আকৃতির দাড়ি রাখতে শুরু করা এবং ‘বেশি ধর্মীয়’ নাম রাখাও চীন সরকারের ভ্রুকুঞ্চনের কারণ হয়ে দেখা দেয়। এতদিন রাস্তায় নিরাপত্তা ক্যামেরা ছিল। এখন উইঘুরদের ঘরের ভেতরই ক্যামেরা লাগিয়েছে সরকার।
গত ১৮ নভেম্বর) চীনের শিনজং প্রদেশের হামি শহরের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করা থেকে শুরু করে রক্ষণশীল ইসলামি রীতি মেনে চলার মতো কাজ করে থাকলে সংশ্লিষ্ট উইঘুরদের উচিত হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিজেদের সোপর্দ করা। যেসব কাজগুলোকে রক্ষণশীলতা বা ইসলামি কাজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: কোরআন অনুযায়ী সারা জীবন কাটানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া, টেলিভিশন দেখতে বাধা দেওয়া, মদ্যপান-ধূমপান-বিয়ের আসরে নাচার বিরুদ্ধে কথা বলা, সরকারি পরিচয়পত্র প্রকাশ্যে ধ্বংস করা- প্রত্যাখ্যান করা, সরকার প্রদত্ত বাসস্থান ও ভর্তুকি প্রত্যাখ্যান করা এবং সিগারেট-মদকে হারাম বলে প্রচারণা চালানো। এদিকে শিনজংয়ের কয়েক লাখ উইঘুরক বিশেষ আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাদের বিষয়ে চীনা সরকারের ভাষ্য, এসব উইঘুরকে চীনা সংস্কৃতির দীক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের নিউ ক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জোয়ান স্মিথ ফিনলে মন্তব্য করেছেন, ঘরের মধ্যে হানদের ঢুকিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ‘চীনা সরকার উইঘুরদের সেই শেষ একান্ত স্থানটিও দখল করে নিয়েছে যেখানে তারা তাদের আত্মপরিচয় প্রকাশ করেত পারত। তুরস্কে বসবাসরত পাঁচজন উইঘুরের সঙ্গে কথা বলেছে বার্তাসংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস। তারা জানিয়েছেন, চীনা সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হান সম্প্রদায়ের সদস্য এমন চীনা কর্মচারীদের উইঘুরদের পরিবারে থাকার আদেশ দিয়েছে। যেসব পরিবারের হান ‘গুপ্তচর’ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে সেসব পরিবারের সদস্যরা প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকেন। তাদের সামনে ভুল করে কিছু বলে ফেলার মতো ঘটনায় জেল তো বটেই, তার চেয়েও খারাপ পরিণতি হতে পারে তাদের। হান গুপ্তচরদের উপস্থিতির কারণে তারা হিজাব পরতে পারেন না, নামাজ পড়তে পারেন না।
কিন্তু ভিন্ন কিছু চিত্রের কথাও উল্লেখ করেছে আল জাজিরা। হানদের পাশাপাশি উইঘুর কর্মচারীকেও উইঘুর পরিবারে অতিথি করে পাঠানো হয়েছে। এমন একজন গু লি। তার ভাষ্য, যে পরিবারের সঙ্গে তিনি থেকেছিলেন, তারা আসলেই তাকে আত্মীয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর শুধু হান বা উইঘুর নয় কাজাখ কর্মচারীদেরও বিভিন্ন নাগরিকদের পরিবারে ‘অতিথি’ হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, জনগণের চাহিদা সঠিকভাবে জানা, যা অফিসে বসে থাকলে ঠিকমত বোঝা যায় না।
জু জিয়াং নামের একজন ‘সরকারি আত্মীয়’ বলেছেন, তিনি যখন তার জন্য নির্ধারিত দরিদ্র উইঘুর পরিবারটিতে গিয়েছিলেন, তখন তিনি চমকে উঠেছিলেন। কারণ সেখানে জানালা দিয়ে আসা আলো ছাড়া, আলোর আর কোনও ব্যবস্থা ছিল না। তবে এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে।
জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে চীনা সরকার নাগরিকদের জীবনমান ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিলেও সরকারি কর্মচারীদের এভাবে উইঘুরদের বাড়িতে ঢুকিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তাদের ধারণা, উইঘুরদের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা আসলে ‘অসভ্য’ ও ‘অসংস্কৃত।’ তাদের জীবনযাপন পদ্ধতির সংস্কার দরকার। ফলে দারিদ্র্য নিরসনে জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সরকারি ভাষ্যের বাস্তবায়নই হোক আর উইঘুরদের সঠিক সংস্কৃতির অনুসারী করে গড়ে তোলাই হোক, আপাতত উইঘুরদের ঘরেই বসতে করবে ‘হান গুপ্তচরেরা।’