সৌদি আরবে আটককেন্দ্রে যেমন কাটে রোহিঙ্গাদের জীবন

মিয়ানমারের রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দেশটির নাগরিকত্ব হারিয়ে রাষ্ট্রহীন। কিছুদিন পরপরই মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিপীড়নের শিকার হতে হয় তাদের। জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড এড়াতে রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশের পাশাপাশি সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। আবার অনেকে উন্নত জীবনের আশায় রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে সৌদি আরব গমন করছে। একসময় সৌদি আরব রোহিঙ্গাদের অনেক অধিকার দিলেও সৌদি যুবরাজ সেই অধিকারগুলো কেড়ে নিয়েছেন। ফলে এখন সৌদি আরবে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক ধরপাকড় চলছে। বন্দি রাখা হচ্ছে আটককেন্দ্রে। এসব আটককেন্দ্র থেকে মুক্তি পেতে রোহিঙ্গারা আবারও বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বারস্থ হচ্ছে। ঘুষের বিনিময়ে নথিপত্র তৈরি করে ফিরে আসছে বাংলাদেশে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব যাওয়া ও ঘুষের বিনিময়ে সেখানে পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসা নিয়ে এক দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আই। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের তিন পর্বে সেই প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো। ভাষান্তর করেছেন মাহাদী হাসান।

rohingya-crisis

দ্বিতীয় পর্ব

জেদ্দাহ-মক্কা এক্সপ্রেসওয়ের পাশেই শুমাইসি আটককেন্দ্র। ২৫ লাখ বর্গমিটার আয়তনের এই ভবনে ৩২ হাজার বন্দি রয়েছে।  কয়েকটি চেকপয়েন্ট এর মাধ্যমে এই ভবনটিকে বাইরের দুনিয়া থেকে একদম আলাদা করে রাখা হয়েছে।

ওই এলাকা আসলে একটি ছোটখাটো শহরের মতো। সেখানে একটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল আছে, প্রতি ঘণ্টায় ১৩ টন কাপড় পরিষ্কার করতে সক্ষম একটি লন্ড্রি রয়েছে। বন্দি প্রত্যেকের জন্য আলাদা বিছানাও রয়েছে বলে দাবি সৌদি কর্তৃপক্ষের।  

তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, শুমাইসি আটককেন্দ্রে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি রয়েছে। সেখানে পদদলিত হয়ে একজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ওই ঘটনায় আহত হয়েছিলেন আরও ৯ জন। ২০১৮ সালে ইয়েমেনি এক বন্দিকে সৌদি কর্মকর্তারা মারধর করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।


 প্রথম পর্ব: যেভাবে বাংলাদেশ হয়ে সৌদি আরব যায় রোহিঙ্গারা


 

সৌদি আরব অনেকদিন ধরেই নিজেদের মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করছে। তুরস্কে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ওয়ালিদ আল খেরেজি বলেন, কেউই রোহিঙ্গাদের জন্য সৌদি আরবের এর চেয়ে বেশি কিছু করেছে বলে দাবি করতে পারবে না।

গত ৭০ বছর ধরে রোহিঙ্গাদের সহায়তা করছে বলে দাবি সৌদি আরবের। ইতিহাসও তাই বলছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সৌদি আরবই প্রথম তাদের কথা বলেছিল।

তবে অন্যান্য আরব দেশের মতোই তারা ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। ফলে শরণার্থী কিংবা আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে তাদের কোনও আইনী কাঠামো নেই। এতে করে রশিদের মতো শরণার্থীরা নিজেদের অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন।  

শুমাইসি আটককেন্দ্রে রোহিঙ্গারা

রশিদ তখন জানতেন না যে শুমাইসিতেই তার আরও ২০ মাস থাকতে হবে। সেখানে যাওয়া মাত্রই তার ফোন, ওয়ালেট ও ঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর অন্যান্য বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আটকে রাখা হয় তাকে। কবে ছাড়া হবে তা সম্পর্কেও কিছু বলা হয়নি। রশিদ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অনেকে ভেবেছিলেন রোহিঙ্গা পরিচয় দিলে হয়তো আরও কিছু সুবিধা পাব। কিন্তু তা হিতে বিপরীত হয়েছে। আমাদের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে আরও শত শত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আটকে দেওয়া হয়।  

আটককৃতরা মিডল ইস্ট আইকে জানান, তারা নামাজ পড়ে, খেলে কিংবা চুরি করা মোবাইল দিয়ে সামাজিকমাধ্যমে গিয়ে সময় কাটাতেন। জেলে তাদের রুটি ও ডাল দেওয়া হতো। কখনও কখনও মাংস। রশিদ বলেন, খাবার পর্যাপ্ত ছিল না। প্রায়ই আমাদের ক্ষুধার্ত থাকতে হতো।

কয়েকজন বন্দি গান গেয়ে ইউটিউবে আপলোড করতো। যুবরাজের কাছে মুক্তি প্রার্থনা করতো। অ্যাক্টিভিস্টদের পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বন্দি রোহিঙ্গার পরিবার আন্দোলন করছে। তাদের আশা কেউ হয়তো কথা শুনবে।

অনেকদিন ধরে বন্দি থাকা রোহিঙ্গারা অসহ্য হয়ে উঠেছিলেন। রশিদ বলেন, সেখানে অনেকেই ৪-৫ বছরের বেশি সময় ধরে বন্দি। তারাও ভেবেছিল শিগগিরই ছাড়া পাবেন, কিন্তু তা আর হয়নি।

জেদ্দায় এক রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্ট বলেন, অনেক বন্দিই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তারা পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আবার তাদেরকে মিয়ানমার ফেরত পাঠানো হতে পারে এমন দুশ্চিন্তাও রয়েছে। সব মিলে তারা বিপর্যস্ত।

মিডল ইস্ট আইকে পাঠানো ভিডিওতে দেখা গেছে, বন্দিদশা থেকেই নিজেদের হতাশা প্রকাশ করছেন তারা। শুমাইসিতে চার বছর আটক থাকা এক রোহিঙ্গাকে টয়লেটে গড়াগড়ি দিতে দেওয়া একটি ভিডিও দেখা যায়। অনেকে বিছানার নিচে বসে ছিলেন।


তৃতীয় পর্ব:  যেভাবে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গারা


 

২০১৬ সালে মিয়ানমার যখন রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান চালায় তখন শুমাইসিতে আটক ছিলেন রশিদ। একটি অবৈধ ফোন দিয়ে তিনি মিয়ানমারের ভয়াবহতার কথা জানতে পারেন। তার আত্মীয়দের কীভাবে হত্যা করা হয়েছে সেটা ভেবে চিন্তিত ছিলেন তিনি। রশিদ বলেন, ‘পুরো পরিস্থিতিতে আমি হতাশ হয়ে পড়ি। আমার কিছুই করার ছিল না। পরিবারের জন্য খুবই দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না।

এরপর ২০১৭ সালের আগস্টে প্রথম পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান রশিদ। তিনি জানান, তখন ফোনকে কানের কাছে ধরে ছিলেন। বাবার কণ্ঠ যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল বারবার। এভাবেই বাবার মুখে শুনেছেন তাদের ওপর ঘটে যাওয়া বিভীষিকার কথা। কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন,  আমার পরিবার  জানায় যে বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পরও বাবা বলছিলেন যেন দুশ্চিন্তা না করি।