দাড়িওয়ালা বিক্ষোভকারীদের গাড়ির বহর, হাতে উঁচু করে ধরা কালো ও সাদা পতাকা, সরষে হলুদ রঙের পোশাক পরা প্রতিবাদকারীরা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে জড়ো হয়েছেন। তাদের আশা, মাত্র দেড় বছর আগে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারবে তারা। এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন দেশটির অন্যতম ইসলামি দল জমিয়তে উলেমা-ইসলামের নেতাকর্মীরা। দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা জড়ো হয়েছেন ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিকে পরিণত হওয়ার ইমরানের পদত্যাগের দাবিতে। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের গাড়ির বহর যতই চোখ ধাঁধানো হোক না কেন সেখানে আরও একটি বিষয় নজর কাড়ছে সবার: এই বিক্ষোভে নেই কোনও নারীর অংশগ্রহণ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলমান এই বিক্ষোভে নারীদের অংশগ্রহণ না থাকা কোনও ভুলের কারণ নয়। রবিবার আজাদি মার্চ শুরু হওয়ার পূর্বে যে লিফলেট প্রকাশ করা হয়েছে তাতে নারীদের ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ‘রোজা ও নামাজ পড়তে’। আর এতে কাজও হয়েছে। জমিয়তের গাড়ির বহর গত পাঁচদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইসলামাবাদে জড়ো হলেও তাতে একজনও নারীও চোখে পড়েনি।
রাজধানীতে পৌঁছার পর জমিয়তের গাড়ির বহরে অপর রাজনৈতিক দলও যোগ দেয়। এসময় শোনা যায় অনুষ্ঠানের খবর সংগ্রহে নারী সংবাদকর্মীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অনেক নারী সংবাদকর্মীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন হয়রানির মুখে তাদের ফিরে আসা ছাড়া উপায় ছিল না।
সাংবাদিক শিফা ইউসুফজাই টুইটারে লিখেছেন, ‘এক লোক আসে এবং বলে নারীদের অনুমতি নেই। এখানে নারীরা থাকতে পারবে না। চলে যান। ধীরে ধীরে কিন্তু এক মিনিটের মধ্যে একদল লোক আমাদের ঘিরে ধরে এবং স্লোগান দিতে শুরু করে। আমাদের চলে আসতে হয়েছে।’
জমিয়তে উলেমার নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান দ্রুতই প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘নারীদের প্রতি আমাদের যথেষ্ট সম্মান রয়েছে’। কিন্তু নারী সংবাদকর্মীরা সমাবেশে ‘পূর্ণ ইসলামি পোশাক’ পরে হাজির হতে পারবে।
তবে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জমিয়তের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নাঈমা কিশাওয়ার খান মিছিলে নারীদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার কথা অস্বীকার করেছেন এবং নারীর অনুপস্থিতিকে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আপনারা যদি সেনাবাহিনীর দিকে তাকান তাহলে দেখবেন পুরুষরা সম্মুখে রয়েছে এবং নারীরা পেছন থেকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। আমাদের আন্দোলন যুদ্ধের মতো। পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। তা না হলে নারীরা পেছনে থাকতেন না।
বিবিসির উর্দু সংস্করণের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, রাজধানীতে বিক্ষোভে যেসব নারী অংশ নিয়েছেন তারা জমিয়ত নয়, অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং নিজেদের আড়ালে রাখছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ না থাকা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে সাংবাদিক বেনজির শাহ এই সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি এটিকে ভালো হিসেবে দেখছেন। বলেন, ‘দুই পুরুষ ও তাদের অহংবোধের লড়াইয়ে এই দেশের নারীদের অংশগ্রহণ করা উচিত না। এই মিছির কোনও সামাজিক পরিবর্তনের জন্য নয়, যেমনটি আমরা লেবাননে দেখছি। সেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমানভাবে অংশগ্রহণ করছে। জমিয়তে উলেমা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারকে উৎখাত করতে চাইছে। এজন্য তারা ধর্মকেও ব্যবহার করছে। এই দেশের নারীদের ইতিহাসের ভুল অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকা উচিত না।’
বেনজির শাহ আরও বলেন, ‘জমিয়তে উলেমা কখনও নারী বান্ধব দল ছিল না। তারা অনার কিলিং বিরোধী আইনের বিরোধিতা করেছে, তারা নারী সুরক্ষা ও বাল্যবিয়ের প্রতিরোধের আইনের বিরোধিতা করেছে। আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত অন্য দলগুলো, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল নারীদের নিয়ে কী করছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অল্প কয়েকজন নারী রয়েছে। পাঞ্জাবের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় নারী আছেন মাত্র দুজন’।