টিভি নিষিদ্ধ ও দাড়ি কাটায় মানা: কেমন ছিল তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান

প্রায় দুই দশক তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার হচ্ছে মার্কিন ও ন্যাটোর সেনা। এর মধ্যেই সশস্ত্র গোষ্ঠী তালেবান দেশজুড়ে আবারও নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে দখলে নিচ্ছে একের পর এক জেলা, শহর ও সীমান্ত। দিন যত এগুচ্ছে আফগান সরকারের কাছ থেকে পুরো ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছ তারা।

আফগানিস্তানের জনগণ একসময় তালেবানের শাসনে ছিল। ইসলামি শাসনের নামে কঠোর আইনে দেশ পরিচালনা করে তারা। বর্তমানে তাদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রসরে আবারও শঙ্কা জেগেছে তারা ক্ষমতা দখল করতে পারে।

এমন বাস্তবতায় সম্প্রতি তালেবান গোষ্ঠী আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত একটি জেলা দখলের পর সেখানকার ইমামকে এক চিঠিতে তাদের প্রথম আদেশ জারি করেছে বলে স্থানীয় অ্যাক্টিভিস্টরা দাবি করেছেন। প্রকাশিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আফগান নারীরা একা বাজারে যেতে পারবে না এবং পুরুষদের দাড়ি কামানো উচিত নয়। ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেউ এই বিধিনিষেধ অমান্য করলে তাকে গুরুতর শাস্তির মুখে পড়তে হবে বলে চিঠিতে সতর্ক করেছে তালেবান।

গত জুনে তালেবানরা উত্তরের কাস্টমস পোস্ট শির খান বন্দর দখল করে নেয়। সেখানে পাঞ্জ নদীতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে একটি সেতু রয়েছে, যা আফগান-তাজিকিস্তানের সাথে যুক্ত করেছে। ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরই সেখানকার নারীদের ঘর থেকে বর না হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে তালেবান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তালেবান কারা?

তালেবান শব্দটি তালেব শব্দের বহুবচন, যার অর্থ জ্ঞান তলবকারী বা ছাত্র, পশতু ভাষার শিক্ষার্থী। (১৯৭৯-৮৯) সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে আফগান মুজাহিদিনরা এই গোষ্ঠীটি গঠন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও পাকিস্তানের আইএসআই’র ব্যাপক সাহায্য ও সমর্থন পায় দেশটির বিভিন্ন আফগান মুজাহিদ গোষ্ঠী। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পর শুরুতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সংঘর্ষে চারদিকে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে।

তালেবানের উত্থান 

১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে প্রায় ৩৫ হাজার আফগান জনগণ নিহত হয়। তখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করে তালেবান। ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে আফগানিস্তানের কান্দাহারে প্রথম তাদের কমিটি কাজ শুরু করে। মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট বুরহানুদ্দিন রব্বানির সরকারকে উৎখাত করে রাজধানী কাবুল দখল করে তালেবান। ১৯৯৬-তে ক্ষমতায় আসার পর কঠোর ইসলামি শরিয়াহ আইনের প্রবর্তন করে তারা। ১৯৯৮ সালে আফগানিস্তানের ৯০ শতাংশ এলাকা তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

যেভাবে আফগানিস্তান শাসন করেছিল তালেবান

সোভিয়েতের পতনের পর যখন আফগান মুজাহিদিনরা অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েন; তখন তালেবানেকে স্বাগত জানায় তারা। তালেবান গোষ্ঠীটি দুর্নীতিসহ অনেক কিছুতেই সফলতা পায়। কিন্তু একের পর এক অঞ্চলে দখলের মধ্যে দিয়ে তাদের শাসন ব্যবস্থা কঠোর করে তোলে। তালেবানের আইন প্রাক-ইসলামিক পশতুন আদিবাসী রীতি ও সৌদি মাদ্রাসার পৃষ্ঠপোষকতার ওয়াহাবি ভাবাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। তাদের আইনে হত্যাকারী ও ব্যাভিচারীদের প্রকাশ্যে ফাঁসির প্রচলন ছিল। এমনকি চুরির দায়েও ফাঁসির আদেশের বিধান ছিল। তালেবানের শাসনে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন অনেকটা সংকুচিত হয়ে পড়ে। দিন যত গড়ায় নাগরিকদের জন্য নতুন নতুন বিধিনিষেধ যুক্ত হয়।

এর মধ্যে মুসলিম পুরুষদের দাড়ি রাখা এবং নারীদের বোরকা পরা বাধ্যতামূলক করে। টেলিভিশন দেখা, গান শোনা ও সিনেমা দেখা নিষিদ্ধ হয়। ১০ বছর বয়সী মেয়েদের পড়া লেখা নিষিদ্ধ করে তালেবান সরকার। নারীরা তালেবানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছিল। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে, ২০০১ সালে তালেবান গোষ্ঠী দেশটিতে বামিয়ান বুদ্ধের মূর্তি ধ্বংস করে দেয়।

নারীদের তুলনায় পুরুষদের কিছুটা স্বাধীনতা থাকলেও নামাজের সময় ধর্মীয় পোশাক পরা বাধ্যতামূলক ছিল। তালেবান ক্ষমতায় থাকার সময় প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারসহ একাধিক স্থাপনায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পেছনে তালেবানের বিরুদ্ধে আল-কায়েদাকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলে ওয়াশিংটন। এরপর তাদের সরকারকে উৎখাত করে আফগানিস্তানে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অবস্থান করে মার্কিন ও ন্যাটো জোটের সেনারা। এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের নির্দেশে আগামী ১১ আগস্টের মধ্যে সব বিদেশি সেনা প্রত্যাহার হচ্ছে। এ অবস্থায় দেশটিতে আবারও তালেবান শাসন ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।