পাকিস্তানি সামার খানের লড়াইটা একটু আলাদা

মাউন্ট এভারেস্টের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ কে২। বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে সাইকেল নিয়ে এই কে২-এর বেসক্যাম্পে পৌঁছানোর রেকর্ড তৈরি করেন সামার খান নামের এক পাকিস্তানি নারী।

একজন অ্যাথলেট হিসেবে ৩১ বছরের সামার খানের অর্জনটা নেহায়েত কম নয়। প্রথম কোনও পাকিস্তানি হিসেবে তিনি শিগার উপত্যকার আরান্দুর বারবুচো চূড়ায় আরোহণ করেন, যা ছয় হাজার ২৫০ মিটার উঁচু। প্রথম পাকিস্তানি হিসেবে কিলিমাঞ্জারো পর্বত জয়ের রেকর্ডও তার।

বেসক্যাম্পে নিজের যাত্রার গল্প সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন সামার খান। তবে এটি ফলোয়ারদের কাছে পর্বতজয়ের খবর পৌঁছানোর চেয়েও বেশি কিছু।

নিজের চেষ্টায় মাউন্টেন বাইকিং শেখেন এই নারী। ওই সময়ে পাকিস্তানে তাকে শেখানোরও কেউ ছিল না। ফলে ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে হয়েছে তাকে। আবার কখনও বা আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটদের কাছ থেকেও শেখার চেষ্টা করেছেন।

সামার খানের ভাষায়, ‘দুই চাকায় ভ্রমণের স্বাধীনতা আমার জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল। একটি সাইকেলে আপনি পাহাড় ঘুরে দেখতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি নিজে পাহাড়ি এলাকা থেকে এসেছি। তাই আমি সত্যিই পাহাড়কে ভালোবাসি।’

বাইকিং তার জীবন বদলে দিয়েছে এবং নিজেকে আরও সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করেছে বলে মনে করেন এই সাহসী নারী।

দেশ-বিদেশে নিজের নানা অর্জন সত্ত্বেও অবশ্য নিজেকে এখনও কোচ হওয়ার জন্য উপযুক্ত বলে মনে করেন না সামার। তার ভাষায়, ‘যদি আপনি পাকিস্তানে কোচিং ও খেলাধুলার প্রসার দেখতে চান, তাহলে আপনাকে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিনিয়োগ করতে হবে। তাদের সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। যদি তারা কোনও ধরনের সাহায্য ছাড়াই এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে তাহলে সরকারি সহায়তা তাদের কোথায় নিয়ে যাবে; একটু ভাবুন।’

তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের এই পর্যায়ে নিয়ে আসা হয় এবং বিদেশে আমাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে সমর্থ হই, তাহলে আমরা ফিরে এসে আমাদের কমিউনিটিকে কিছু দিতে পারবো।’

এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বদলে বরং সমালোচনা ও হয়রানির মুখোমুখি হওয়ার কথা জানান সামার খান। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং দেশে খেলাধুলার প্রসারের জন্য আমরা কীভাবে চিন্তা করতে পারি? এক্ষেত্রে আপনাকে অন্তত একটি প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের অ্যাকটিভ থাকার পেছনে খেলাধুলরা প্রচার একটি বড় কারণ বলে উল্লেখ করেন সামার খান। জানান, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যথাসাধ্য বাছাইকৃত পোস্ট ও ভিডিও শেয়ার করছেন। নিজের জানাশোনার পরিধি আর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অন্যদের অবগত করছেন।

তিনি বলেন, অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস সরাসরি পর্যটনের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে কাজের জন্য সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য তার অনুরোধ, এমন লোকদের বেছে নিন যাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে।Samar Khan 03

যত প্রতিবন্ধকতা

সাইকেল নিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ জয় সহজ বিষয় নয়। তবে এর চেয়েও কঠিন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে সামার খানকে। কারণ পাকিস্তানের মতো একটি দেশে একজন নারী বাইকার হওয়া খুব সহজ নয়।

সামার খান বলেন, পাকিস্তানে নারীদের বাইকিংয়ের জন্য অনেক এলাকা নিরাপদ। আবার অনেক এলাকা সেভাবে নিরাপদ নয়। এখানে লোকজনের মধ্যে একটি মিশ্র মানসিকতা রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং শিক্ষার কল্যাণে কিছু লোকজনের চিন্তাভাবনা প্রসারিত হলেও এখনও নানা বাধা রয়েছে।

তার ভাষায়, ‘এমন একটি দিনও যায় না যেদিন আমি রাস্তায় হয়রানির মুখোমুখি হই না। রাস্তায় হয়রানি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্র্যাকটিস চালিয়ে যেতে একবার তিন থেকে চারজনের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে।’

শুধু রাস্তাঘাটে নয়, বরং প্রতিবন্ধকতা যেন সর্বত্র। সামার খানের ভাষায়, ‘কর্মকর্তারা আমার প্রতিভার চেয়ে আমার বয়স ও বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কে বেশি আগ্রহী ছিলেন। তারা অদ্ভুত মন্তব্য করেছে এবং আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে।’

তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো পর্যায়ে থাকা লোকজনও কর্মক্ষেত্রে নারীদের হয়রানি করার চেষ্টা করে। এটা সর্বত্রই ঘটে থাকে। এসবের ফলে মেয়েদের আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলাধুলায় আসতে অনেক সময় লাগবে। তবে হয়তো আমার মতো কিছু মানুষ আছে, যারা সিস্টেমের সঙ্গে লড়াই করার চেষ্টা করছে এবং অন্যদের জন্য এটি সহজ করে তুলছে।

গত ১৪ আগস্ট লাহোরে ছয় সঙ্গীর সঙ্গে ভিডিও বানাতে গিয়ে আক্রান্ত হন এক নারী টিকটকার। মিনার-ই-পাকিস্তানের কাছে তাদের ওপর হামলে পড়ে তিন থেকে চারশ‌‌' মানুষ। টানাহেঁচড়ার এক পর্যায়ে তার পরনের পোশাকও ছিঁড়ে ফেলে তারা। ছিনিয়ে নেয় সঙ্গে থাকা গহনাও। সেদিনের এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, সামার খানের লড়াইটা কতটা কঠিন ছিল?