পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা

কে এই ওমর মনসুর?

পাকিস্তানি তালেবান কমান্ডার ওমর মনসুর

ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স মনসুরকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের সবচেয়ে ঘৃণিত লোক: ভলিবল খেলোয়াড়, শিশু হত্যাকারী’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মনসুরের বয়স ৩৭ বছর এবং তার তিন সন্তান রয়েছে। ভলিবল খেলতে আগ্রহী এবং মনসুরের ডাকনাম ‘চিকনা’।

 


 

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার চারসাদ্দায় অবস্থিত বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার দায় স্বীকার করে ফেসবুকে এক পোস্ট দিয়েছিলেন পেশাওয়ার হামলার মূল হোতা ওমর মনসুর। তিনি দাবি করেছিলেন, তেহরিক-ই তালেবান, পাকিস্তান (টিটিপি) এ হামলা চালিয়েছে। পরে সেই পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়। হামলায় ৩০ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে টিটিপির একাংশের অপারেশনাল প্রধান ওমর মনসুর। গত বছর পাকিস্তানের পেশাওয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুলে হামলায় নিহত হয় ১৩২ জন শিশু ও নয় জন স্কুল কর্মচারী। পাকিস্তানের ইতিহাসে ভয়াবহ এ সন্ত্রাসী হামলার মূল হোতা ছিলেন ওমর মনসুর।

বুধবার বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার দায় স্বীকার করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া এবং তা সরিয়ে নেওয়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছেন ওমর মনসুর।

বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহতদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

সাংবাদিক হাসান আব্দুল্লাহ পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম ডনকে জানান, চারসাদ্দা, দারা আদাম খেল, নশেরা ও এর আশপাশের এলাকায় টিটিপির একাংশের কমান্ডার। তিনি বলেন, ‘হাকিমুল্লাহ মেহসুদের খুব ঘনিষ্ঠদের একজন ছিলেন মনসুর। এক সময় ওমর খালিদ খোরসানিরও ঘনিষ্ঠ ছিলেন।’ হাসান আব্দুল্লাহ আরও জানান, ২০১৪ সালে পাকিস্তান সামরিক অভিযান শুরু করলে মনসুর আফগানিস্তান চলে যান। ধারণা করা হয় এরপর মনসুর বেশ কয়েকবার পাকিস্তানে এসেছেন।

ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স মনসুরকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের সবচেয়ে ঘৃণিত লোক: ভলিবল খেলোয়াড়, শিশু হত্যাকারী’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মনসুরের বয়স ৩৭ বছর এবং তার তিন সন্তান রয়েছে। ভলিবল খেলতে আগ্রহী এবং মনসুরের ডাকনাম ‘চিকনা’।

পেশাওয়ারে হামলার পর তালেবানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে মনসুরকে দেখা যায়। ভিডিওতে তালেবান দাবি করে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ নিতেই স্কুলে হামলা চালানো হয়েছে।

পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা

রয়টার্স ছয় পাকিস্তানি তালেবানের সাক্ষাৎকার নিয়ে নিশ্চিত হয় হয় যে, হামলার মূল হোতা ছিলেন মনসুর। চারজন জানান, মালালা ইউসুফজাইকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া টিটিপি নেতা মোল্লাহ ফজলুল্লাহ’র ঘনিষ্ঠ ছিলেন মনসুর। অপর দুই তালেবান সদস্য জানান, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন মনসুর। পরে তিনি মাদ্রাসায় ভর্তি হন।

এক তালেবান কমান্ডার জানান, মনসুরের দুই ভাই রয়েছেন। ২০০৭ সালে তালেবানে যোগ দেওয়ার আগে মনসুর করাচিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। মনসুরের ডাকনাম ‘নারায়’। পশতু এ শব্দের অর্থ ‘চিকন’। মনসুরের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।

আরও প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে

তালেবানের ওয়েবসাইটে প্রচারিত ভিডিওতে পেশাওয়ার ও পার্শ্ববর্তী দারা আদাম খেল এলাকার ‘আমির’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এক তালেবান কমান্ডার জানান, মনসুর সরকারের সঙ্গে আলোচনার ঘোর-বিরোধী। কমান্ডার বলেন, ‘শুরু থেকেই মনসুর এ অবস্থানে অনড়। সরকারের প্রতি দুর্বলতা বা সহানুভূতি কারণে অনেক কমান্ডারকে বাদ দিয়েছেন মনসুর।’

তবে ওমর মনসুরের টিটিপির  গিদার গ্রুপ দায় স্বীকার করলেও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন তালেবানের আরেকাংশের এক মুখপাত্র মোহাম্মদ খোরাসানি।  এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'এ হামলায় টিটিপি কিংবা টিটিপি প্রধান মাওলানা ফজলুল্লাহ জড়িত নন। বেসামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠরতদের দেশের ভবিষ্যত বলেই বিবেচনা করি আমরা। তারা মুসলিম এবং তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই।'

এ ধরনের হামলার ঘটনাকে শরিয়াহবিরোধী উল্লেখ করে খোরাসানি বলেন, যারা তালেবানের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের হামলা চালাচ্ছে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ধার হওয়া এক শিক্ষক

উল্লেখ্য ২০১৩ সালের শেষ দিকে মাওলানা ফজলুল্লাহ তালেবানের নেতৃত্ব নেওয়ার পর সংগঠনটি অন্তত চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

২০০৭ সালে বায়তুল্লাহ মেহসুদ পাকিস্তানের বিবদমান কিছু দলকে একত্রিত করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে গঠন করেন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান। যা পাকিস্তানি তালেবান হিসেবেও পরিচিত।  পরবর্তী সময়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে শরিয়া আইন চালুর দাবিতে মেহসুদের নেতৃত্বে তালেবানরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ২০০৯ সালে টিটিপি নেতা বাইতুল্লাহ মেহসুদ মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন। এরপর হাকিমুল্লাহ মেহসুদ তার উত্তরসূরি হন। হাকিমুল্লাহ’র নেতৃত্বে টিটিপি পাকিস্তান সরকার ও জনগণের ওপর আত্মঘাতী বোমা হামলা শুরু করে।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাওলানা ওমর কাসমির নেতৃত্বে একটি গ্রুপ বের হয়ে গঠন করে আহরার-উল-হিন্দ। পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনার অভিযোগ তুলে বের হয়ে যায় গ্রুপটি। একই বছরের মে মাসে টিটিপির মেহসুদের নেতৃত্বাধীন প্রধান অংশ থেকে আরেকটি অংশ বের হয়ে যায়। খালিদ মেহসুদের নেতৃত্বে গ্রুপটি বের হয়ে গড়ে তোলে তেহরিক-ই-তালিবান দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান। এ গ্রুপটি ছিল টিটিপির সবচেয়ে বড় গ্রুপ। গ্রুপটি চাঁদাবাজি, অপহরণ, জনগণের সম্পদ ধ্বংস করাকে ইসলামবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে। আগস্টে এসে টিটিপির সবচেয়ে কট্টরপন্থী অংশ সাতটি উপজাতি জেলা নিয়ে গড়ে তোলে তেহরিকই-তালেবান পাকিস্তান জামায়াতুল আহরার। এ গ্রুপটির নেতৃত্ব দেন ওমর খালিদ খোরোসানি। উপজাতি এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে ফজলুল্লাহ’র নির্দেশের বিরোধীতা করে এ গ্রুপটি বের হয়ে যায় টিটিপি থেকে। পরে ২০১৫ সালে মার্চে পুনরায় গ্রুপটি টিটিপির সঙ্গে একীভূত হওয়ার ঘোষণা দেয়। টিটিপির আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বেশ কিছু সংখ্যক উজবেক ও আরব যোদ্ধা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হয়ে যুদ্ধ করতে ইরাকে যান।  একই মাসে পাঞ্জাবি তালেবানের কমান্ডার আসমাতুল্লাহ মোয়াইয়া তার গ্রুপকে নিয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ না করার ঘোষণা দেন।

২০১৪ সালের অক্টোবরে টিটিপির মুখপাত্র শহিদুল্লাহ শহিদ এবং ওরাকাজি, খুররাম ও খাইবার উপজাতি জেলা এবং পেশাওয়ার ও হাঙ্গু জেলার টিটিপি কমান্ডাররা আইএসকে সমর্থনের ঘোষণা দেন। সূত্র: ডন, রয়টার্স, উইকিপিডিয়া।

/এএ/বিএ/