মিয়ানমারের ‘তাতমাদো’ এত নৃশংস কেন?

মিয়ানমারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অং সান সু চিকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাতের এক বছর পার হয়েছে। ‘তাতমাদো’ হিসেবে পরিচিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই সময়ে কয়েকশ’ বেসামরিককে হত্যা ও বিক্ষোভকারীদের নৃশংসভাবে দমন করে বিশ্বকে হতবাক করেছে। কিন্তু কীভাবে তাতমাদো এত প্রভাবশালী হয়ে উঠলো এবং কেন তারা এত নৃশংস? ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

মিয়ানমারের জান্তা প্রধান

তাতমাদের কী?

বার্মিজ ভাষায় তাতমাদের শব্দের অর্থ সশস্ত্রবাহিনী। কিন্তু এই নামটি বর্তমান সামরিক কর্তৃপক্ষের পরিচয় হয়ে উঠেছে মূলত দেশে তাদের ব্যাপক ক্ষমতা ও বিশ্বব্যাপী কুখ্যাতির জন্য। তাতমাদোর শেকড় বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি (বিআইএ) পর্যন্ত বিস্তৃত। অং সান সু চি’র বাবা অং সানসহ একদল বিপ্লবী ১৯৪১ সালে বিআইএ গঠন করেন। ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের কিছুদিনের মধ্যে অং সান নিহত হয়। তার মৃত্যুর আগে থেকেই বিআইএ অপর মিলিশিয়াদের সঙ্গে সমন্বয় করে জাতীয় সশস্ত্রবাহিনী গঠনের কাজ করে। স্বাধীনতার পর এখন যে তাতমাদো তা হিসেবে পরিণতি পায়।

স্বাধীনতার পর এই বাহিনীর দ্রুত ক্ষমতা ও প্রভাব অর্জন করে। ১৯৬২ সালে অভ্যুত্থানে দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং কার্যত বিরোধিতাহীনভাবে পরের ৫০ বছর শাসন করে।

মিয়ানমারের প্রতিমূর্তি

মিয়ানমারে ১৩০টিরও বেশি জাতিসত্তা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো বৌদ্ধ বামার জাতি। বামাররা আবার দেশটির অভিজাত শ্রেণি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনাবাহিনী নিজেদের এই অভিজাতদের মধ্যেও কুলীন মনে করে।

আধুনিক মিয়ানমারের ইতিহাসে নিজেদের জাতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তুলে ধরেছে তাতমাদো। প্রায়ই তারা নিজেদের দেশের প্রতিমূর্তি হিসেবে তুলে ধরে। যার অর্থ হলো, তারাই প্রকৃত বার্মিজ।

ব্যাংককের চুলালনংকর্ন ইউনিভার্সিটির মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ গুয়েন রবিনসন বলেন, এটি একেবারে উগ্র জাতীয়তাবাদী আদর্শ। তারা সব সময় সংখ্যালগু গোষ্ঠীগুলোকে হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে। তাদের মতে, এসব গোষ্ঠী মিয়ানমারের ঐক্য ও স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করতে চায়।

সেনাবাহিনী বিভিন্ন জাতির মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে টানা লড়াইয়ে লিপ্ত। অনেক বিশ্লেষকের কাছে এটি বিশ্বের দীর্ঘতম চলমান গৃহযুদ্ধ।

রবিনসন বলেন, এটিই তাতমাদোকে একটি নৃশংস লড়াইয়ের মেশিনে পরিণত করেছে। যারা রোবটের মতো শুধু নির্দেশ পালন করে।

একের পর এক অভিযানে অংশ নেওয়ার ফলে সেনারা যুদ্ধবাজ এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে দেশের ভেতরে হত্যায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের মতো কিছু সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী তাতমাদোর সবচেয়ে নৃশংসতার শিকার হয়েছে। এখন বামার বৌদ্ধসহ কয়েকশ’ বিক্ষোভকারী নিজেদের সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে।

অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া অং সান সু চির বিচার চলছে জান্তার আদালতে

বিক্ষোভকারীরা বিশ্বাসঘাতক

রবিনসনের মতে, তাতমাদোর কাছে সবাই একজন সম্ভাব্য বিদ্রোহী। তিনি বলেন, তারা এই বিক্ষোভকারীদের বিশ্বাসঘাতক মনে করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে সেনাদের মধ্যে একটি পরিবারের অনুভুতির জন্ম দেয়, কর্মকর্তাদের সন্তানরা অনেক সময় নিজেদের অপর কর্মকর্তার সন্তানের সঙ্গে বিয়েতে বসে।

রবিনসন বলেন, সেনাবাহিনী একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো। বাইরের সঙ্গে তাদের খুব বেশি যোগাযোগ নেই।  

‘রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র’

তাতমাদোর বেশিরভাগ চিন্তা-ভাবনা এখনও রহস্যময়। ২০২০ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারের মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা স্কট মারসিয়েল বলেন, প্রকৃতপক্ষে এটি রাষ্ট্রের ভেতর একটি রাষ্ট্র। সমাজের অন্যদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বেশি নেই। তারা একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে তারা একে অপরকে নিজেরা কত গুরুত্বপূর্ণ তা শিক্ষা দেয়। তারা শেখায় তারাই দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে, তাদের ক্ষমতা ছাড়া দেশ ভেঙে পড়বে।

জান্তা প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের নির্দেশে কাজ করে সেনাবাহিনী। তবে বিশ্লেষকরা তাকেই সব সমস্যার শেকড় হিসেবে মানতে রাজি নন।

মারসিয়েল বলেন, আমি মনে এটি একটি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানটির সংস্কৃতিই মূল সমস্যা। জান্তা প্রধান এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি।

অন্য যে কোনও সময়ের তুলনায় তাতমাদো নিজেদের একটি ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে কাজ করছে। আর তা হলো, গোপন লড়াইয়ের শক্তি, ক্ষমতাবাদ এবং শুধু নিজের কাছেই দায়বদ্ধ।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূথ বলেন, মূলকথা হলো, আমার কাছে মনে হয় বিশ্ব কী ভাবছে তা নিয়ে তাদের কোনও  চিন্তা নেই।