‘অসম্ভব যাত্রা’: অস্কারে যেভাবে ভুটানের চলচ্চিত্র

ভুটানের একটি প্রত্যন্ত লুনানা উপত্যকায় যখন ৩৫ জন মানুষ একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি নেন তাদের সামনে ছিল অনেক বাধার পাহাড়। উপত্যকায় নেই বিদ্যুৎ। কাছের গ্রাম থেকে সেখানে পৌঁছানো যায় কেবল হেঁটে, লাগে আট দিন। আর চলচ্চিত্রে অভিনয় করা স্কুল শিশুদের অভিনয় কিংবা সিনেমা সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই।

গ্রামের স্কুল শিক্ষক নামগায় দর্জি বলেন, এমনকি তারা জানেই না ক্যামেরা কী বা তা দেখতে কেমন।

মঙ্গলবার ভুটানের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছে ‘লুনানা: অ্যা ইয়াক ইন দ্য ক্লাসরুম’। এটি পরিচালনা করা পায়ো চয়নিং দর্জি জানান, সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে তিন মাইল উচ্চতার হিমালয়ের গ্রামে চলচ্চিত্রটি শুট করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই তাকে ‘অসম্ভব যাত্রা’ মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

৩৮ বছর বয়সী এই পরিচালক বলেন, এই যাত্রা এতই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল যে আমার মনে হয়েছিল হয়ত আমি চলচ্চিত্রটি শেষ করতে পারব না। যেভাবেই হোক এখন আমরা অস্কারের মনোনয়ন তালিকায় অবস্থান করছি। যখন আমি তা জানতে পারি তা আমার কাছে একেবারে অবিশ্বাস্য ছিল। আমি বন্ধুদের বলতেছিলাম, যদি কাল ঘুম থেকে উঠার পর মনে হয় এটি স্বপ্ন ছিল, তখন কী হবে?

যোগেশ গৌরব ছিলেন চলচ্চিত্রটির বুম অপারেটর

‘অন্ধকার উপত্যকা’

‘লুনানা’ শুক্রবার ডিজিটালি মুক্তি পেয়েছে। এতে এক তরুণ শিক্ষকের কথা বলা হয়েছে। রাজধানী থিম্পুতে বসবাসকারী এই শিক্ষককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রত্যন্ত পাহাড়ি স্কুলে কাজে পাঠানো হয়। তিনি স্বপ্ন দেখেন সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর এবং সেখানে গায়ক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তুলার।  

কিন্তু লুনানার মানুষ  উগিয়েন নামের এই শিক্ষককে মুগ্ধ করে। বিশেষ করে ৯ বছরের পেম জেম। এক দীপ্তিমান শিক্ষার্থী যার বাড়িতে কঠিন জীবন। দিন যেতে থাকলে শিক্ষকতার কাজে গুরুত্ব দিতে থাকেন তিনি।

পরিচালক জানান, লুনানা উপত্যকাকে শুটিংয়ের জন্য বেছে নেওয়ার কারণ হলো এটি বিদেশি আধুনিক শহরের একেবারে বিপরীত। এটি বলতে গেলে বিচ্ছিন্ন, এমনকি হিমালয়ের দেশটির মান অনুসারে। ভুটানে ভাষায় লুনানা অর্থ অন্ধকার উপত্যকা।

দর্জি বলেন, আমরা আইডিয়া ছিল: আমরা কী সেই ছায়া ও অন্ধকার খুঁজে পেতে পারি যেখানে আমরা এত বেপরোয়া হয়ে আলো খুঁজছি।

সিনেমার একটি দৃশ্যে পেম জাম (বায়ে)

স্বাভাবিকতা ধরে রাখা

দর্জির কল্পনাকে চলচ্চিত্রে রূপায়ণ করা ছিল অনেক বড় কর্মযজ্ঞ। লুনানা উপত্যকা চীনের পশ্চিম সীমান্তের কাছে। রয়েছে হিমবাহের হ্রদ এবং বিশ্বের কয়েকটি উঁচু চূড়া। গাড়ি নিয়ে সেখানে পৌঁছানো যায় না। গত বছর করোনাভাইরাসের টিকা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের হেলিকপ্টারে যেতে হয়েছিল। তারা তুষার ও বরফে হেঁটে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়েছিলেন।

দর্জির ক্রুরা যখন ২০১৮ সালের গ্রীষ্মের শেষ দিকে লুনানা যান তখন তারা আগুন জ্বালানোর কাঠ, ব্যাটারি, সোলার চার্জার ও জরুরি সরঞ্জাম খচ্চরে কাঁধে তুলে দেন। তারা নষ্ট হয় না এমন খাবার, যেমন- শুকনো মিষ্টি কুমড়ো ও মাশরুম নিয়ে যান। কারণ সেখানে কোনও ফ্রিজের ব্যবস্থা নেই। যখন তারা সেখানে পৌঁছান তাদের থাকার জন্য অস্থায়ী ঘর নিজেদেরকেই নির্মাণ করতে হয়েছিল।

একটি ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ করার পর্যাপ্ত সৌর বিদ্যুৎ ছিল। কিন্তু রাতে পরিচালকের ফুটেজগুলো যাচাই করার মতো বিদ্যুৎ ছিল না। যেমনটি করে থাকেন বেশিরভাগ পরিচালক। ফলে তাকে সবচেয়ে ভালোর নিজের সহজাত প্রবৃত্তি ও আশায় থাকতে হয়েছে।

 

চলচ্চিত্রের জন্য নির্বাচিত অভিনেতারা ছিলেন আরেক চ্যালেঞ্জ। প্রধান তিনটি চরিত্রই ছিলেন অপেশাদার অভিনেতা। অন্যরা ছিলেন লুনানার বাসিন্দা। যেখানে মানুষেরা কৃষি ও পাহাড়ি ছত্রাক চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কখনও কোনও সিনেমা দেখেননি।

দর্জি জানান, চরিত্রগুলোর অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে তাকে চিত্রনাট্য তাদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে সাজাতে হয়েছে। তাদেরকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে তাদের মতো করে কাজ করে যেতে। যেমন- পেম জাম চরিত্রটির প্রকৃত নাম মুভিতে ব্যবহার করা হয়েছে।

পরিচালক জানান, চলচ্চিত্রে যে ধারাবাহিকতায় দেখানো হবে শটগুলো তা অনুসারে ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। যাতে করে গল্পের সঙ্গে চরিত্রগুলোর উন্নতি হয়। তিনি একটি দৃশ্য যুক্ত করেছেন, যাতে তিনি মনে করেন একেবারে গ্রামের প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে। একটি উদাহার দেন তিনি: এক দৃশ্যে দেখা যায় শিক্ষক উগিয়েন তার শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছেন কীভাবে দাঁত ব্রাশ করতে হয়। ওই সময় শিক্ষার্থীরা অভিনয় করেনি, বাস্তবেই তারা জানে না কীভাবে ব্রাশ করতে হয়।

অস্কারজয়ী পরিচালক অ্যাং লি গত মাসে এক ভিডিও কলে দর্জিকে বলেছেন, চলচ্চিত্রটিতে সফলভাবে নিষ্পাপতার অনুভূতি ধারণ করা গেছে। তিনি ‘লুনানা’-কে মুক্ত বাতাসের এক নিশ্বাস বলে বর্ণনা করেছেন।

লি বলেন, এটি খুব মূল্যবান। খুব সরল কিন্তু খুব বেশি ছুঁয়ে যায়। এত কিছুর মধ্য যাওয়া এবং আপনার দেশ ও সংস্কৃতি আমাদের সামনে তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ।

কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রীর সঙ্গে পরিচালক

বৈশ্বিক পরিচিত

গত বছর অস্কারে লুনানাকে দাখিল করেছিল ভুটানের সরকার। কিন্তু তা অযোগ্য বলে বাতিল হয় যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন না করায়। ২০২২ সালের জন্য সরকার একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। ডিসেম্বরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাঠানো ৯৩টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ১৫টির সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান করে নেয় এটি। আর মঙ্গলবার এটি আরও সংক্ষিপ্ত ৫টির তালিকায় স্থান পেয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ফিচার ফিল্ম ক্যাটাগরির এই তালিকায় রয়েছে জাপান, ডেনমার্ক, ইতালি ও নরওয়ের চলচ্চিত্র।

দর্জি জানান, এই চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ডলার। তিনি কখনো ব্যাপকভাবে চলচ্চিত্রের পাবলিসিটির কথা বিবেচনা করেননি। কিন্তু এখন তা পরিবেশনায় যুক্ত হয়েছে স্যামুয়েল গোল্ডউইন ও বিপননের দায়িত্বে রয়েছে নিউ ইয়র্ক ও বেভারলি হিলসে কার্যালয় থাকা একটি পাবলিক রিলেশন্স এজেন্সি।

চলচ্চিত্রটির সফলতার কথা পৌঁছে গেছে লুনানাতে। গ্রাম প্রধান ৫১ বছর বয়সী কাকা জানান, বিশ্বে তাদের গ্রাম পরিচিত হওয়াতে তারা খুব খুশী।

যার বাস্তব জীবন চলচ্চিত্রটিতে আংশিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেই স্কুল শিক্ষক নামগায় দর্জি (৩৫) জানান, চলচ্চিত্রটির আন্তর্জাতিক সাফল্য তাকে গ্রামটিতে পরিকল্পনার চেয়ে বেশি দিন থাকতে অনুপ্রাণিত করেছে। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য চলচ্চিত্রে হাজির হওয়া এই শিক্ষক বলেন, আমি যখন ক্যামেরার সামনে ছিলাম, আমার মধ্যে খুব বেশি উদ্দীপনা ছিল না। কিন্তু এটি দেখার পর এবং শিক্ষার্থীদের সংলাপ শুনে আমি বুজতে পেরেছি যে আমাদের সমাজকে কতটা কঠিন পথ অতিক্রম করতে হবে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।