কী, কেন, কীভাবে

পাকিস্তানকে একঘরে করার মোদির কৌশল যেভাবে ‘বুমেরাং’ হলো

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় এক জনসভার পোডিয়ামে মুষ্টিবদ্ধ আঘাত করে পাকিস্তানের নেতাদের সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গোধূলির আলোয় সমর্থকদের বিশাল সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানকে একঘরে করতে ভারত সফল হয়েছে এবং আমরা এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করবো। আমরা নিশ্চিত করবো যেন বিশ্বজুড়ে আপনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।’

দিনকয়েক আগে ভারত-শাসিত কাশ্মিরে এক সশস্ত্র হামলায় ১৮ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার জবাবে মোদি ওই কঠোর মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের নেতাদের শুনে রাখা উচিত, আমাদের ১৮ জন সেনার আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।’

কিন্তু সেই ঘোষণার এক দশক পর বর্তমান বাস্তব চিত্র বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। পাকিস্তান আজ বিশ্বমঞ্চে একঘরে হওয়া তো দূরের কথা, বরং তারা চীনের অন্যতম প্রধান কৌশলগত মিত্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চীন সফর করেছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অধীনে ওয়াশিংটনের কাছেও পাকিস্তান এখন অন্যতম এক বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে পুনরুত্থিত হয়েছে।

হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান

বিগত এক বছরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উভয়েই হোয়াইট হাউজে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এমনকি চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের মধ্যে ইসলামাবাদ এখন দুই দেশের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। খোদ ট্রাম্পও একাধিকবার পাকিস্তানি নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি যেমন ট্রাম্পকে আপন করে নেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ‘চতুর কূটনীতি’র সাফল্য, ঠিক তেমনি এটি মোদি সরকারের কৌশলগত ভুলেরও এক বড় প্রমাণ। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানকে দুর্বল এবং একঘরে করার ভারতের যে কৌশল ছিল, তা বড় আকারে বুমেরাং হয়েছে।’

যুদ্ধবিরতি ও নোবেল বিতর্ক

২০২৫ সালের ১০ মে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ঘোষণা করেন যে পারমাণবিক অস্ত্রধারী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিনি একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ রাতের আলোচনার পর, আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে ভারত ও পাকিস্তান একটি পূর্ণাঙ্গ এবং তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’

এর পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চার দিনের তীব্র লড়াইয়ের অবসান ঘটানো এই যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্পের ‘নেতৃত্ব ও সক্রিয় ভূমিকা’র প্রতি ধন্যবাদ জানান। এটি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত; যাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সীমান্তের দুপাশেই বহু মানুষ নিহত হয়েছিলেন। ভারত-শাসিত কাশ্মিরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের ভেতরে ‘সন্ত্রাসী’ ঘাঁটিতে হামলা চালালে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।

নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এপি

তবে শাহবাজ শরিফের মতো মোদি এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখেন, যদিও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব যুদ্ধবিরতির কথা নিশ্চিত করেছিলেন। এর মাত্র কয়েক মাস আগেই ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন মোদি।

এর কিছু দিন পর ট্রাম্প কাশ্মির সমস্যা সমাধানের জন্য দুই দেশের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন। ভারতের জন্য ট্রাম্পের এই শান্তিপ্রিয় অবতার হয়ে ওঠা ছিল বেশ অস্বস্তিকর। কারণ ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই দীর্ঘকাল ধরে দাবি করে আসছে যে কাশ্মির একটি দ্বিপাক্ষিক ইস্যু এবং এখানে তৃতীয় কোনও পক্ষের হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। যদিও ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ অবসানে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ভূমিকা রেখেছিলেন।

২০২৫ সালের জুন মাসে মোদি যখন কানাডা সফরে ছিলেন, তখন ট্রাম্প তাকে ওয়াশিংটনে আসার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু মোদি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ফোনে ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন ভারত কোনও তৃতীয়পক্ষের মধ্যস্থতা গ্রহণ করবে না এবং মে মাসের যুদ্ধবিরতি কেবল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফল।

তবে ট্রাম্পও দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি ৩০টিরও বেশি অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন যে তিনিই ভারত-পাকিস্তানের এই যুদ্ধবিরতি করিয়েছেন এবং কোটি কোটি মানুষের প্রাণহানি হতে পারতো এমন একটি পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকিয়েছেন। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, যুদ্ধের প্রথম দিনই পাকিস্তানের মাটিতে বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছিল, যা মূলত পাকিস্তানের দেওয়া বিবৃতিরই প্রতিধ্বনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মে মাসের ওই হামলার পেছনে পাকিস্তানের উসকানি ছিল, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এমন কোনও প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে নয়া দিল্লি। কুগেলম্যান বলেন, ‘বিশ্বের কোনও দেশই ভারতকে পাল্টা হামলা করতে উৎসাহিত করেনি। আন্তর্জাতিক মহল লক্ষ করেছে যে পহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের জড়িত থাকার কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ভারত দিতে পারেনি।’ ফলে এই প্রচারণা যুদ্ধে পাকিস্তানই জয়ী হয়েছে। তাছাড়া, পাকিস্তান যে বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, এই বিষয়টি হোয়াইট হাউজসহ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক মনোযোগ কেড়েছে। প্রায় তিন সপ্তাহ নীরব থাকার পর ভারতের শীর্ষ জেনারেল স্বীকার করেন পাকিস্তানের হামলায় বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে, যদিও সংখ্যাটি ভারত কখনও প্রকাশ করেনি।

মোদি এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব ট্রাম্পকে দিতে অস্বীকার করায় মার্কিন-ভারত সম্পর্কে ফাটল ধরে। অন্যদিকে, পাকিস্তান ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। এরপর থেকেই ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউজে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান এবং তাকে নিজের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ ও ‘অসাধারণ মানুষ’ হিসেবে অবিহিত করেন, যা ভারতকে চরম হতাশ করেছে।

সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর ভারত বিশ্বমঞ্চে ‘কৌশলগত সংযম’-এর নীতি অনুসরণ করতো। তারা যুদ্ধের চেয়ে কূটনীতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইতো। এই নীতির কারণেই ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পরও তৎকালীন কংগ্রেস সরকার পাকিস্তানের ওপর সামরিক হামলা চালানো থেকে বিরত ছিল। কিন্তু বিরোধী দলে থাকাকালীন মোদির দল বিজেপি এই সংযমের তীব্র সমালোচনা করেছিল।

ক্ষমতায় আসার পর মোদি প্রথমে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তার শপথ অনুষ্ঠানে তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং নওয়াজের নাতনির বিয়েতে আচমকা লাহোরেও গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালের উরি হামলার পর ভারত তাদের নীতি পুরোপুরি বদলে ফেলে। মোদি সরকারের মন্ত্র হয়ে ওঠে, ‘সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।’

চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

২০১৬ সালে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক এবং ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলায় ৪০ সেনা নিহতের জবাবে পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা চালায় ভারত। অনেক বছর ধরে ভারতের এই কঠোর অবস্থান কাজও করেছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এবং জো বাইডেনের আমলে মোদি প্রায়ই ওয়াশিংটন যেতেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও ভারত সফর করেছিলেন, কিন্তু কেউ পাকিস্তানে যাননি।

তবে গত বছরের সামরিক সংঘাতের পর এই সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়। ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের কারণে এমনিতেই ওয়াশিংটন-নয়া দিল্লি কৌশলগত সম্পর্ক কিছুটা চাপে ছিল। চলতি সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত সফরকালে জানান ট্রাম্প ভারতকে ভালোবাসেন। তবে বাণিজ্য নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর চাপ বজায় রেখেছে। রুবিও এক্স-এ জানিয়েছেন, ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন নয়া দিল্লির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে। রুবিও ভারতের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপের বিষয়টিকেও সমর্থন করেছেন।

আঞ্চলিক সহযোগিতা থেকে বিচ্যুতি ও সার্কের মৃত্যু

২০১৪ সালে মোদি যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন তার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির অংশ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার সব নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালের পর ইসলামাবাদে আয়োজিত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করে ভারত। এর ফলে সম্মেলনটি বাতিল হয়ে যায় এবং এরপর থেকে সার্কের আর কোনও শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। সার্ককে এক প্রকার পরিত্যক্ত করে ভারত ‘বিমসটেক’-কে চাঙা করার চেষ্টা করলেও তা শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি।

ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ইমেরিটাস ইশতিয়াক আহমদ বলেন, ‘পাকিস্তানকে একঘরে করতে গিয়ে ভারত কার্যত সার্ককেই বিসর্জন দিয়েছে।’ এদিকে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের সঙ্গে ইসলামাবাদের ‘অটুট’ বন্ধনের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং শি জিনপিং।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত কেবল সার্কই ত্যাগ করেনি, বরং তারা তাদের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা জোটনিরপেক্ষ নীতি থেকেও দূরে সরে এসেছে এবং একটি ‘লেনদেনমূলক’ নীতি গ্রহণ করেছে। অতীতে ভারত কেবল জাতিসংঘের অনুমোদন পেলেই অন্য দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করতো। কিন্তু মোদি সরকার মার্কিন চাপে প্রথমে ইরান থেকে তেল আমদানি হ্রাস করে এবং ২০১৮ সালে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার পর ইরান থেকে তেল কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, যা ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় ধাক্কা ছিল।

ইসরায়েল তোষণ ও ইসলামবিদ্বেষ

একইভাবে মোদি সরকার ফিলিস্তিন নীতিতেও বড় পরিবর্তন এনেছে। ১৯৭৪ সালে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধি হিসেবে পিএলও-কে এবং ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম আরববহির্ভূত দেশগুলোর একটি ছিল ভারত। ১৯৯২ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পরও ভারত সব সময় ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিল।

কিন্তু মোদির আমলে ভারত এখন ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা এবং অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘে ইসরায়েলবিরোধী প্রস্তাবে ভারত এখন প্রায়ই ভোটদান থেকে বিরত থাকে। গত মাসে ব্রিকস সম্মেলনেও ভারত ফিলিস্তিন সংকটের ভাষা হালকা করার চেষ্টা করেছে এবং গাজার গণহত্যা নিয়ে একবারও নিন্দা জানায়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর ঠিক দুদিন আগে মোদি ইসরায়েল সফর করেন, যা ভারতের জ্বালানি আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যে ভারতকে একপেশে করে তুলেছে।

ইসরায়েলের প্রতি ভারতের এই অন্ধ সমর্থন যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়াচ্ছে, ঠিক তখনই পাকিস্তান তেলসমৃদ্ধ জিসিসি দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব গভীর করেছে। গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

একই সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরে মোদি সরকারের ক্রমাগত মুসলিমবিদ্বেষী নীতি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করছে। ২০২২ সালে বিজেপির মুখপাত্র নুপুর শর্মার মহানবী (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা, মসজিদ ভাঙা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। পাকিস্তান এই ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সফলভাবে ব্যবহার করেছে এবং ওআইসির সহযোগিতায় জাতিসংঘে ১৫ মার্চ-কে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করাতে সক্ষম হয়েছে।

যেভাবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হলো পাকিস্তান

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পাকিস্তান অত্যন্ত কৌশলের সঙ্গে ক্রিপ্টো মাইনিং এবং বিরল খনিজ সম্পদ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে। গত জুলাইয়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খনিজ সরবরাহের চুক্তি সই করে, যেখানে একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এই খনিজগুলোর বাজার মূলত চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওভাল অফিসে এবং ডিসেম্বরে মার-এ-লাগো রিসোর্টে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন শাহবাজ ও আসিম মুনির। জাতিসংঘের সাবেক পাকিস্তানি দূত মাসুদ খান বলেন, এই কৌশলী কূটনীতি ও খনিজ চুক্তির কারণেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর হয়েছে।

বাস্তবতা বুঝতে পেরে ভারতও এখন তাদের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনার আভাস দিচ্ছে। জানা গেছে, গত তিন মাসে দুই দেশের সাবেক সেনা জেনারেল এবং অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকরা অন্তত দুবার বৈঠকে বসেছেন। এমনকি বিজেপির আদর্শিক অভিভাবক আরএসএস-এর একজন শীর্ষ নেতা এবং ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরভানে পাকিস্তানের সঙ্গে পুনরায় সংলাপ শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র অ্যানালিস্ট প্রবীণ দোনথি সতর্ক করে বলেছেন, মূল সমস্যার সমাধান না হলে দুই দেশের মধ্যে আবারও যুদ্ধ অনিবার্য। তিনি বলেন, ‘ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাছে জিম্মি হয়ে আছে। চীন যেহেতু এখন পাকিস্তানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, তাই ভারতের উচিত হবে না পাকিস্তানকে কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা। এই অচলাবস্থা ভাঙতে দুই দেশকে অবশ্যই উচ্চ পর্যায়ের ব্যাক-চ্যানেল বা পর্দার আড়ালের কূটনীতি শুরু করতে হবে।’

সূত্র: আল জাজিরা