মুম্বাইয়ের যে ক্লাবের পরিচালনা কমিটিতে এখনও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ

দিল্লির জিমখানা ক্লাবের পর এবার তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে মুম্বাইয়ের অভিজাত ব্রিচ ক্যান্ডি ক্লাব। ঔপনিবেশিক মানসিকতা, আভিজাত্যের দম্ভ এবং ঐতিহ্যের নামে বৈষম্য টিকিয়ে রাখার অভিযোগে ক্লাবটিকে নিয়ে নেটদুনিয়ায় এখন তুমুল বিতর্ক চলছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর জানিয়েছে।

মালাবার হিলের কাছে প্রিমিয়াম ভুলাভাই দেশাই রোডের পাশে অবস্থিত এই সুবিশাল ক্লাবটিতে রয়েছে চমৎকার লোনা পানির সুইমিং পুল, সাজানো লন, টেনিস কোর্ট এবং আরব সাগরের দিক মুখ করা বিলাসবহুল ডাইনিং। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এর ভেতরের বিখ্যাত আউটডোর পুলটি তৈরি করা হয়েছে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের মানচিত্রের আদলে। সমালোচকদের মতে, ক্লাবের পুলের এই নকশাই তাদের এখনও বয়ে বেড়ানো ঔপনিবেশিক মানসিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

যেখানে একসময় ভারতীয়দের প্রবেশই ছিল নিষিদ্ধ

বিগত প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই ক্লাবের চৌকাঠ মাড়ানো ভারতীয়দের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। এই বর্ণবৈষম্য এতটাই চরম ছিল যে, অতিরিক্ত রোদে পোড়ার কারণে কোনও ইউরোপীয় ব্যক্তির গায়ের রং কিছুটা তামাটে হয়ে গেলেও তাকে গেটে আটকে বিদেশি প্রমাণের জন্য পাসপোর্ট দেখাতে বলা হতো।

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পরও ক্লাবটি তাদের ‘শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য’ নীতি কঠোরভাবে বজায় রেখেছিল। ১৯৬৬ সালের দিকে এক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান কূটনীতিককে ক্লাব থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর আন্তর্জাতিকভাবে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর ১৯৬০-এর দশকে অ-ইউরোপীয়দের জন্য ক্লাবের দরজা খোলে।

তবে দরজা খুললেও সমঅধিকার মেলেনি। ১৯৬৭ সালে সিটি সিভিল কোর্ট কর্তৃক অনুমোদিত ক্লাবের সংবিধানে সদস্যদের স্তরে একটি বড় বৈষম্য তৈরি করা হয়। সাধারণ ভারতীয়রা এখানে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দিতে পারলেও ক্লাবের মূল প্রশাসনিক ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে ‘ট্রাস্ট মেম্বার’দের হাতে। এখন পর্যন্ত এই ট্রাস্টের নিয়ম অনুযায়ী ট্রাস্টের সদস্যপদ কেবল ‘বোম্বাইয়ে বসবাসরত ইউরোপীয় নাগরিকদের’ জন্যই সংরক্ষিত। শুধু এই ইউরোপীয় ট্রাস্ট সদস্যদেরই ভোট দেওয়ার, ব্যবস্থাপনা কমিটিতে দাঁড়ানোর এবং ক্লাবের মূল সম্পত্তির ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অধিকার রয়েছে।

পুরোনো বিতর্ক যেভাবে নতুন করে সামনে এলো

কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের একটি পুরোনো ব্লগ পোস্ট ইন্টারনেটে নতুন করে ভাইরাল হওয়ার পর এই বিতর্ক আবার চাঙ্গা হয়। সেখানে থারুর ১৯৬০-এর দশকে নিজের একটি অপমানজনক অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে লিখেছিলেন যে, ‘১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বোম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি ক্লাব থেকে আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। আমার এক আমেরিকান সহপাঠী ভেবেছিল সে ‘শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য’ নিয়মটি উপেক্ষা করে তার একজন ভারতীয় বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে। স্বাধীনতার ২০ বছর পরও ভারতের অবস্থা এমন ছিল।”

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে থারুর আরও লিখেছিলেন, ‘সরকারি জমিতে এমন একটি বর্ণবাদী নিয়ম টিকে থাকার কোনও গ্রহণযোগ্য যুক্তি হতে পারে না। ক্লাবের সংবিধানের দোহাই দেওয়াটা হাস্যকর। আমাদের দেশের সংবিধানের মূল্য কোথায়?’

ব্যবসায়ী হর্ষ গোয়েঙ্কাও এক্স  হ্যান্ডেলে এই বৈষম্যের তীব্র সমালোচনা করে লিখেছেন, ‘মুম্বাই সবসময় অন্তর্ভুক্তি ও প্রগতির কথা বলে। অথচ কয়েক দশক আগেও এখানে ভারতীয়দের সদস্যপদ দেওয়া হতো না। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজও কোনও ভারতীয় এর ট্রাস্ট কমিটিতে থাকতে পারেন না, কেবল মুম্বাইয়ে থাকা ইউরোপীয়রাই পারেন। সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, এই জমির মালিক মহারাষ্ট্র সরকার!’

এনডিটিভির পক্ষ থেকে এই বিষয়ে যোগাযোগ করলে ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাদের নিশ্চিত করেছে যে, ভারতীয়দের সাধারণ সদস্যপদ দেওয়া হলেও ‘ট্রাস্টি’র পদ তাদের জন্য বন্ধ। এমনকি বর্তমানে স্থায়ী সদস্যপদ দেওয়া বন্ধ থাকায় তারা কেবল ১ থেকে ৪ বছরের জন্য যে অস্থায়ী সদস্যপদ দিচ্ছে, সেটিও কেবল ইউরোপীয় পাসপোর্টধারীদের জন্য সংরক্ষিত, যেখানে ভারতীয়দের আবেদন করার কোনও সুযোগ নেই।

এডেন থেকে বোম্বাই: ক্লাবের ইতিহাস

১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের চূড়ান্তে ব্রিচ ক্যান্ডি সুইমিং বাথ ট্রাস্ট নামে এটি নিবন্ধিত হয়। ব্রিচ ক্যান্ডির পাথুরে ও বিপজ্জনক উপকূলে ব্রিটিশদের জন্য সমুদ্রে সাঁতার কাটা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল খোলার আগে ব্রিটিশ যাত্রীরা ইয়েমেনের এডেন বন্দরে যাত্রাবিরতি করতেন এবং বোম্বাইয়ের ইউরোপীয়রা সেখানে একটি ট্রানজিট হোস্টেল বানিয়েছিলেন। সুয়েজ খাল চালুর পর সেই হোস্টেলটি অকেজো হয়ে পড়লে তা ৭ হাজার ৩০০ রুপিতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেই টাকা, সঙ্গে ভারতের সেক্রোটারি অব স্টেটের দেওয়া ৫ একর উপকূলীয় জমি এবং মেজর জেনারেল হ্যারি ব্যারের দেওয়া ৯৩০ পাউন্ডের অনুদানে ‘ইউরোপীয় সম্প্রদায়ের জনকল্যাণার্থে’ এই সুইমিং ফেসিলিটি তৈরি করা হয়।

অর্থ দিয়ে মেলে না আভিজাত্য

মুম্বাইয়ের পুরোনো ধনী, কূটনীতিক, শিল্পপতি ও অভিজাত পরিবারের সমার্থক এই ব্রিচ ক্যান্ডি ক্লাব। ক্লাবের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক হিসাব বেশ গোপন রাখা হয়। তবে এক দশক আগের ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর ব্যক্তিগত সদস্যপদ ফি ছিল প্রায় ১.১২ কোটি রুপি, বার্ষিক ফি ১৫ হাজার থেকে ১৭ হাজার রুপি এবং করপোরেট প্যাকেজ ছিল প্রায় ৩০ লাখ রুপি। তবে ভেতরের মানুষরা জানান, এখানে টাকাটা মুখ্য নয়; বংশমর্যাদা, সামাজিক অবস্থান এবং পুরোনো সদস্যদের সুপারিশই এখানে প্রবেশের মূল চাবিকাঠি।

২০১২ সালের দিকে ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটি ও মূল্যবান জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইউরোপীয় ট্রাস্ট সদস্য এবং কয়েকজন ভারতীয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে আইনি লড়াই শুরু হয়। ২০১৩ সালে ইউরোপীয় ট্রাস্ট সদস্যরা নাটকীয়ভাবে তৎকালীন কমিটিকে ভোট দিয়ে সরিয়ে একজন ইংরেজ চেয়ারম্যানের অধীনে নতুন নেতৃত্ব গঠন করেন। মামলাটি বোম্বাই হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। ২০১৫ সালের টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালত ক্লাবের ‘শুধু ইউরোপীয়দের জন্য’ ট্রাস্ট কাঠামো বহাল রাখে এবং ২০২২ সালে এর বিরুদ্ধে আপিলও খারিজ হয়ে যায়। এই দীর্ঘ মামলার খরচের কারণে একসময় ক্লাবটি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছিল এবং কর্মচারীদের বেতন ও দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যাহত হয়েছিল।