পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের এক মাসের মাথায় তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ভাঙন এখন খাদের কিনারায় গিয়ে ঠেকেছে। বুধবার দলটি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্য বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা (এলওপি) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন স্পিকার রথীন্দ্র বোস। এমনকি বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতার জন্য বরাদ্দ কক্ষের চাবিও তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর জানিয়েছে।
বিধানসভার এই নাটকীয় ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফিরহাদ হাকিম কলকাতার মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর ফলে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো। এর আগে এক জরুরি সিদ্ধান্তে ‘আত্মপর্যালোচনার’ অজুহাতে তৃণমূল তাদের সব কমিটি ও সহযোগী সংগঠন ‘অবিলম্বে’ বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
রাজ্য রাজনীতিতে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বুধবার তৃণমূল নেত্রীর জন্য একটি নতুন ভূমিকা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুরোধ করব তিনি যেন এই বিরোধী ফ্রন্টের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন।’
ঋতব্রতের এই কৌশলটি মহারাষ্ট্রে শরদ পাওয়ারের দল এনসিপি ভাঙার সময় অজিত পাওয়ারের নেওয়া কৌশলের কথা মনে করিয়ে দেয়, ওই সময় দল ভেঙেও মুখে শরদ পাওয়ারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা হয়েছিল।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিষয়ে অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন নতুন এই বিরোধীদলীয় নেতা। ঋতব্রত বলেন, পশ্চিমবঙ্গের অষ্টাদশ বিধানসভা গঠনের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও ধরনের সম্পর্ক নেই।
বুধবার সকালে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় গিয়ে দাবি করেন, তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৯ জনেরই সমর্থন তার পক্ষে রয়েছে। স্পিকারের কাছে দেওয়া চিঠিতে এই অংশটিকেই ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেস বলে দাবি করা হয় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই এই অংশের নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য দাবি করছে, এই পুরো ভাঙন প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে বিজেপি। তৃণমূল নেতা মানব জয়সওয়াল বলেন, ‘কী ঘটছে তা সবাই জানে।’
বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন, তা নিয়েই মূলত তৃণমূলের এই অভ্যন্তরীণ বিরোধের সূত্রপাত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু সিপিএম থেকে তৃণমূলে যোগ দেওয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সন্দীপন সাহা দাবি করেন, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থনে জমা দেওয়া চিঠিতে বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। এই জালিয়াতির অভিযোগটি বর্তমানে রাজ্যের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে দেখছে।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই অবশ্য তৃণমূলে এই ভাঙনের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হচ্ছিলো। দুর্নীতি ও আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামলানো নিয়ে একের পর এক নেতা দলের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছিলেন। গত সপ্তাহে এই বিদ্রোহী নেতাদের অনেককেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা একটি বৈঠকে অংশ নিতে দেখা গিয়েছিল।