মহাজাগতিক মেরুপ্রভা কোথায় কোথায় দেখা যাবে

সূর্য গত কয়েক দিন ধরেই এই পরিস্থিতির জন্য তৈরি হচ্ছিল। অবশেষে গত ৬ জুন ২০২৬ তারিখে সূর্যের বুকে এক প্রকাণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। সাগর যেভাবে ঢেউ আছড়ে ফেলে, ঠিক সেভাবে কোনও বাধা না মেনে প্রতি সেকেন্ডে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বেগে প্রায় ১০০ কোটি টন ওজনের চৌম্বকীয় প্লাজমার মেঘ মহাকাশে ছুড়ে দেয় সূর্য। দুই দিন ধরে পথ পাড়ি দিয়ে সেই মেঘ এখন পৃথিবীর খুব কাছে চলে এসেছে এবং আজ সোমবার তা পৃথিবীতে আঘাত হানছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টার ইতোমধ্যে একটি ‘জি৩’ বা শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় সৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী সাময়িকভাবে আরও তীব্র ‘জি৪’ রূপ নিতে পারে। এই ঝড়ের চূড়ান্ত প্রভাব দেখা যাবে সোমবার রাত ১১টা ৩০ মিনিট থেকে মঙ্গলবার (৯ জুন) ভোর ২টা ৩০ মিনিটের (ভারতীয় সময়) মধ্যে। এর ফলে সোমবার রাতে ভারতের আকাশেও দেখা যেতে পারে চোখ ধাঁধানো মেরুপ্রভা বা অরোরা। লাদাখের কনকনে ঠাণ্ডা ও নিস্তব্ধ প্রান্তর এখন অপেক্ষা করছে এক বিরল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির জন্য।

মেরুপ্রভা বা নর্দার্ন লাইটস হলো মূলত সবুজ, বেগুনি ও লাল আলোর পর্দা, যা সূর্যের চার্জিত কণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে রাতের আকাশে তরঙ্গায়িত হয়ে ভেসে ওঠে। আক্ষরিক অর্থেই এটি সূর্যের ক্রোধের এক অপরূপ সুন্দর রূপ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত মেরু অঞ্চল থেকে অনেক দূরে থাকায় সাধারণ নিয়মে এ দেশে মেরুজ্যোতি দেখা যাওয়ার কথা নয়।

ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের তীব্রতা ‘জি১’ থেকে ‘জি৫’ পর্যন্ত মাপা হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে একটি চরম মাত্রার ‘জি৫’ ঝড় পুরো ইন্টারনেট দুনিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল এবং ভারতের আকাশেও মেরুপ্রভা আলো ছড়িয়েছিল।

ভারতে এমন ঘটনা আগে কেবল একটি জায়গাতেই ঘটেছে লাদাখের হানলে এলাকায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত ইন্ডিয়ান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরি’র অল-স্কাই ক্যামেরায় গত ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি রাতে পুরো আকাশ লাল হয়ে উঠতে দেখা গিয়েছিল। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছিলেন যে সেটি কোনও রঙিন ছবি নয়, বরং হিমালয়ের শীতল মরুভূমির বুকে জেগে ওঠা এক নীরব মেরুপ্রভা ছিল।

সোমবার রাতেও হানলেতে সেই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ঝড়টি শক্তিশালী হলে চার্জিত আলোর দীপ্তিময় বলয়টি দক্ষিণ দিকে সরে আসবে এবং হানলেতে মেরুপ্রভা দেখার বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া নুব্রা ভ্যালি, প্যানগং তসো, কাশ্মীরের কিছু অংশ এবং উত্তরাখণ্ড হিমালয়ের উচ্চতর অঞ্চলগুলোতে উত্তর দিগন্তে হালকা লাল বা গোলাপি আভা দেখা যাওয়ার ক্ষীণ কিন্তু বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা বা চেন্নাইয়ের মতো বড় শহরগুলোর নিজেদের কৃত্রিম আলোই তাদের এই মহাজাগতিক দৃশ্য দেখার ক্ষেত্রে অন্ধ করে রেখেছে। কৃত্রিম আলোর দূষণের কারণে এসব শহরের মাটি থেকে আকাশে কিছুই দেখা যাবে না। রাতে যারা লাদাখে আছেন, তারা মাঝরাতের পর উত্তর দিকে মুখ করে লং-এক্সপোজার ক্যামেরা নিয়ে অপেক্ষা করতে পারেন; কারণ মানুষের চোখের চেয়ে ক্যামেরায় এই আলো আগে ধরা পড়ে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, এটি হয়তো আইসল্যান্ডের মতো আকাশ জুড়ে তীব্র আলো ছড়াবে না, তবে এটি হবে অনেক শান্ত এবং বিরল। ভারতের মতো একটি জায়গায় এমনটি ঘটা হবে অত্যন্ত অসাধারণ এক অনুভূতি।

ভারতের চেয়ে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে রাতে মেরুপ্রভা দেখার সম্ভাবনা অনেক বেশি। উত্তর আমেরিকার মিনিয়াপলিস, সিয়াটল, ব্যাঙ্গর এবং কানাডার আলবার্টা, সাসকাচোয়ান ও অন্টারিও সরাসরি এই জোনের মধ্যে রয়েছে। ইউরোপের স্কটল্যান্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, উত্তর জার্মানি এবং পোল্যান্ডের আকাশেও এটি দেখা যাবে। আইসল্যান্ডে তো এটি দেখার ক্ষেত্রে কোনও অজুহাতেরই প্রয়োজন পড়ে না। অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া, নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ দ্বীপ এবং আর্জেন্টিনা ও চিলির দক্ষিণ প্রান্তে দক্ষিণী মেরুপ্রভা দেখার সুযোগ মিলতে পারে। বিশ্বব্যাপী এটি দেখার সেরা সময় হলো স্থানীয় সময় রাত ১০টা থেকে ভোর ২টা।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে