১০ কোটি রুপি বিনিয়োগে রিটার্ন ১ লাখ কোটি, ‘টাইটান’ কর্পোরেশনের অবিশ্বাস্য গল্প

তামিলনাড়ুর সবচেয়ে মূল্যবান এবং লাভজনক বিনিয়োগ কোনও সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা সরকারি খাতের বিশাল কোনও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়। এটি মূলত একটি নীরব রাষ্ট্রীয় করপোরেশন, যা ১৯৮৪ সালে একটি সাধারণ ঘড়ি নির্মাতা কোম্পানিতে ১০ কোটি রুপিরও কম পুঁজি বিনিয়োগ করেছিল। আর আজ চার দশক পর এসে সেই পুঁজিতে ভর করে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ লাখ কোটি রুপির মালিক হয়েছে।

এই করপোরেশনটির নাম তামিলনাড়ু ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (টিডকো)। আর সেই ঘড়ি নির্মাতা কোম্পানিটি হলো ভারতের বিখ্যাত ব্র্যান্ড টাইটান। এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘড়ির ব্যবসার চেয়েও বড় এক অবিশ্বাস্য বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্ম দিয়েছে।

সম্প্রতি অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর নতুন সিরিজ ‘মেড ইন ইন্ডিয়া - এ টাইটান স্টোরি’-তে স্বাভাবিকভাবেই জেআরডি টাটা, জেরক্সেস দেশাই এবং একটি বিশ্বমানের ভারতীয় ব্র্যান্ড গড়ে তোলার পেছনের গল্পটি আলোয় এসেছে। কিন্তু এই পরিচিত টাটা কিংবদন্তির আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে এক কম আলোচিত মূল চরিত্র। সেটি হলো তামিলনাড়ুর শিল্প উন্নয়ন শাখা ‘টিডকো’। প্রতিষ্ঠানটি একাধারে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট, জমির মালিক, লাইসেন্স নেভিগেটর এবং দীর্ঘমেয়াদি শেয়ারহোল্ডার হিসেবে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি খুব ভালো করেই জানত যে, কখন ব্যবসায় হস্তক্ষেপ করতে হবে এবং কখন ব্যবসায়ীকে নিজের মতো কাজ করতে ছেড়ে দিতে হবে।

লাইসেন্স রাজের সেই জটিল ‘হ্যাক’

১৯৮৪ সালের সেই দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া যাক। ভারত তখনও ‘লাইসেন্স রাজ’-এর কঠোর বেড়াজালে বন্দি। ঘড়িকে তখন বিলাসদ্রব্য হিসেবে গণ্য করা হতো এবং বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এইচএমটি’র। সেই সময়ে বড় পরিসরে ঘড়ি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হতো লাইসেন্স, বিদেশি প্রযুক্তির অনুমোদন, যন্ত্রপাতি আমদানির ছাড়পত্র এবং দিল্লির আমলাতন্ত্রের অন্তহীন অনুমতি।

টাটা গোষ্ঠীর কাছে পুঁজি, বিশ্বাসযোগ্যতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বৈশ্বিক সম্পর্ক সবই ছিল। অন্যদিকে তামিলনাড়ু সরকারের (টিডকো) কাছে ছিল জমি, লাইসেন্স ও এম জি রামচন্দ্রনের মতো এক রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যিনি রাজ্যে বড় কোনও শিল্প গড়তে উদগ্রীব ছিলেন।

এই দুই শক্তির মেলবন্ধনে এমন এক যৌথ উদ্যোগ গড়ে ওঠে, যা আজকের দিনে কল্পনা করাও কঠিন। কাগজে-কলমে প্রাথমিক চুক্তিটি সরাসরি টাটার সঙ্গেও ছিল না। দিল্লির আমলাতন্ত্রকে সতর্ক করা এড়াতে প্রকল্পটি প্রথমে জেরক্সেস দেশাই এবং মিনু মোদি পরিচালিত কুয়েস্টার ইনভেস্টমেন্টস-এর মাধ্যমে আসে। কেন্দ্রের চূড়ান্ত অনুমোদন মেলার পরই কেবল টাটা গ্রুপ রাইটস ইস্যুর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যুক্ত হয়।

ততক্ষণে ব্যবসার মূল কাঠামোটি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। টিডকো ও টাটা ইন্ডাস্ট্রিজ যৌথভাবে এর সহ-উদ্যোক্তা হয়। কোম্পানির নাম দেওয়া হয় টাইটান, যা মূলত টাটা ইন্ডাস্ট্রিজ এবং তামিলনাড়ু নামের এক চমৎকার মিশ্রণ। তামিলনাড়ুর হোসুরের একটি শিল্পাঞ্চলে এর প্রথম কারখানা স্থাপন করা হয়।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও টাটার জাদু

দুই পক্ষের কাজের বিভাজন ছিল অস্বাভাবিক রকমের স্পষ্ট। তামিলনাড়ু সরকার জমি, অবকাঠামো ও লাইসেন্স সরবরাহ করে টিডকোর মাধ্যমে শেয়ার নেয়। আর টাটা নিয়ে আসে তাদের ব্র্যান্ডিং কৌশল, প্রযুক্তি, বিপণন এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি।

ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্য বজায় ছিল। কোম্পানির চেয়ারম্যানের পদটি বরাদ্দ থাকত তামিলনাড়ু সরকার মনোনীত একজন আইএএস কর্মকর্তার জন্য, আর টাটা গোষ্ঠী নিয়োগ করত ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি)। একপর্যায়ে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের (আরবিআই) বর্তমান গভর্নর শক্তিকান্ত দাসও টাইটানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এটি কেবল নামমাত্র কোনও পর্ষদ আসন ছিল না; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং বেসরকারি কার্যকারিতার মধ্যে এক নিবিড় অংশীদারত্ব ছিল।

ব্যবসায়িক দিক থেকেও টাইটানের সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত সাহসী। ভারত যেখানে মেকানিক্যাল ঘড়ির বাজারে আটকে ছিল, টাইটান তখন কোয়ার্টজ ঘড়ির ওপর বাজি ধরে। তারা হোসুরে কারখানা তৈরি করে এবং বেঙ্গালুরুতে সদর দফতর স্থাপন করে, যা ছিল প্রতিভাবান কর্মীদের এক বড় উৎসস্থল এইচএমটির খুব কাছাকাছি।

কারখানার এই ভৌগোলিক অবস্থান কোম্পানিটিকে দারুণ সুবিধা দেয়। এইচএমটির সরকারি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকা প্রতিভাবান প্রকৌশলী, সুপারভাইজার এবং পরিচালকদের টাইটান নিজেদের দিকে টেনে নেয়, যারা একটি গতিশীল কর্মসংস্কৃতির জন্য ক্ষুধার্ত ছিলেন। টাইটান তাদের কাজের স্বাধীনতা এবং ক্যারিয়ারের নতুন ছন্দ উপহার দেয়। ওদিকে জেরক্সেস দেশাই কেবল একটি কারখানাই গড়ছিলেন না, তৈরি করছিলেন একটি ব্র্যান্ড তৈরির যন্ত্র। বিজ্ঞাপনের একটি সাধারণ বানান ভুল থেকে শুরু করে রঙের প্রুফ পরীক্ষা, সবকিছুতেই তার নিখুঁত নজরদারি ছিল।

হোসুর কেবল কারখানার গল্প নয়

টাইটানের হাত ধরে হোসুর শহরেরও খোলনলচে বদলে যায়। সীমানা ঘেঁষা একটি সাধারণ শিল্পাঞ্চল থেকে এটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় কাঁচামাল সরবরাহকারী, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আনুষঙ্গিক ইউনিট এবং শ্রমিকদের আবাসন সংস্থানে ঠাসা এক বিশাল শিল্প ইকোসিস্টেমে।

কোম্পানিটি নামক্কাল ও কৃষ্ণগিরির মতো জেলাগুলো থেকে দশম শ্রেণি পাস করা তরুণদের নিয়োগ দেয়, তাদের নিখুঁত কাজের প্রশিক্ষণ দেয় এবং একটি জাতীয় ব্র্যান্ডের মূল কারিগর বানিয়ে তোলে। ১৯৮৯ সালে টাইটান যখন বাজারে তাদের কোয়ার্টজ ঘড়ি নিয়ে আসে, প্রথম বছরই তারা লাভের মুখ দেখে। এটি কোনও ভাগ্য ছিল না; এটি ছিল সুযোগের সঠিক ব্যবহার, প্রতিভা ও রাষ্ট্র-সমর্থিত শিল্প পরিকল্পনার এক যৌথ ফসল।

গেম চেঞ্জার ‘তনিষ্ক’

তবে ব্যবসার মূল মোড় ঘোরে আরও পরে। ১৯৯৬ সালে ‘তনিষ্ক’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে টাইটান অলঙ্কারের বাজারে প্রবেশ করে। স্থানীয় জুয়েলার্স এবং পারিবারিক স্বর্ণকারদের আধিপত্য থাকা একটি অসংগঠিত বাজারে এটি ছিল এক চরম অনিশ্চিত বাজি।

কিন্তু পণ্যের গুণগত মানের নিশ্চয়তা, আধুনিক ডিজাইন এবং ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর ভর করে টাইটান ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা জয় করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জুয়েলারি পোর্টফোলিওতে যুক্ত হয় জয়া, মিয়া এবং ক্যারাটলেন। এর পাশাপাশি তারা চশমা ও ফ্যাশন অনুষঙ্গের ব্যবসাতেও নাম লেখায়, যা টাইটানকে টাটা গ্রুপের অন্যতম মূল্যবান একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে পরিণত করে।

শেয়ার ধরে রাখার দূরদর্শিতা

এই পুরো যাত্রায় টিডকো একটি বিরল কাজ করেছে, তারা কখনও তাদের শেয়ার বিক্রি করেনি। আইপিও আসার পরও তারা শেয়ার ধরে রেখেছে, অর্থনৈতিক উদারীকরণের সময়েও ধরে রেখেছে। এমনকি টাইটানের বাজার মূলধন যখন ১ লাখ কোটি রুপি ছাড়িয়ে ৪ লাখ কোটি রুপির দিকে এগিয়ে গেছে, তখনও তারা অবিচল ছিল। আজ টাইটানের প্রায় ২৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক টিডকো, যা স্বয়ং টাটা সন্সের চেয়েও বেশি। টিডকোর সম্পূর্ণ পোর্টফোলিও মূল্যের সিংহভাগই আসে এই একটিমাত্র কোম্পানির শেয়ার থেকে।

আজ ভারতের যেকোন প্রান্তে একটি তনিষ্কের চুড়ি বিক্রি হলে, একটি ফাস্টট্র্যাক ঘড়ি কেনা হলে কিংবা টাইটানের নতুন কোনও শোরুম চালু হলে তা কেবল টাটার সাফল্যের খতিয়ানই বাড়ায় না, সমানভাবে সমৃদ্ধ করে তামিলনাড়ু সরকারের কোষাগারকেও।

কেন এই মডেল আজও প্রাসঙ্গিক?

ঠিক এই কারণেই টাইটান কেবল একটি কর্পোরেট সাফল্যের গল্প নয়; এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের একটি আদর্শ উদাহরণ।

একটি মাঝারি সারির রাষ্ট্রীয় করপোরেশন কীভাবে সঠিক বেসরকারি অংশীদার খুঁজে বের করে সামান্য কিন্তু অর্থপূর্ণ পুঁজি বিনিয়োগ করেছিল, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঠিক ব্যবহারে প্রকল্পের ঝুঁকি কমিয়েছিল, ব্যবস্থাপনার অধিকার সুরক্ষিত রেখেছিল এবং সবশেষে ধৈর্য ধরে মুনাফাকে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে দিয়েছিল, টাইটান তারই প্রমাণ।

আজকের যুগে যখন অনেক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কেবল স্বার্থের খেলা কিংবা স্বজনতোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, সেখানে টাইটান গত ৪০ বছর ধরে প্রমাণ করে চলেছে যে, ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ না করেও রাষ্ট্র কীভাবে একজন নিয়মতান্ত্রিক এবং সফল বিনিয়োগকারী হতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি