মমতার তৃণমূল কি কংগ্রেসে বিলীন হচ্ছে?

তবে কি নিজের পুরোনো ঘরেই ফিরে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? ১৯৯৭ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন তিনি। যে বিষয়টি এক সপ্তাহ আগেও কল্পনা করা অসম্ভব ছিল, তা এখন ভারতের রাজনৈতিক অলিন্দে এক তীব্র গুঞ্জন। তবে চূড়ান্ত কোনও ঘোষণা আসার আগপর্যন্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখনও এই সম্ভাবনার পাশে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নই রাখছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি সত্যিই তার তৃণমূলকে কংগ্রেসে বিলীন করে দিচ্ছেন? ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে এ খবর জানিয়েছে।

রাজনীতিতে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। নয়াদিল্লির সংবাদমাধ্যমে এই আলোচনার পেছনে রয়েছে এক নজিরবিহীন ঘটনাক্রম। পশ্চিমবঙ্গে যখন তৃণমূলের বিধায়কদের মধ্যে পুরোদমে বিদ্রোহ চলছে, একের পর এক কাউন্সিলর ও স্থানীয় নেতা আক্রান্ত হচ্ছেন, ঠিক তখনই রাজ্য সামলানোর বদলে দিল্লিতে অবস্থান করছেন মমতা ও তার ভাতিজা তথা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

দিল্লিতে বিরোধী দলগুলোর ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিয়েছেন মমতা। লোকসভায় ২৯টি এবং রাজ্যসভায় ১২টি আসন নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি-বিরোধী জোটের তৃতীয় বৃহত্তম দল হওয়া সত্ত্বেও, তৃণমূল এতদিন নিজস্ব কৌশলে চলত এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে মমতার সম্পর্ক খুব একটা সুমধুর ছিল না। তবে এবারের এই ঘনিষ্ঠতা নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। মঙ্গলবার কয়েক বছর পর সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসেন মমতা। জানা গেছে, তাদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল তৃণমূলের ভবিষ্যৎ এবং জোটের রাজনীতি। এরপর বুধবার কংগ্রেসের মূল চালিকাশক্তি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবারই সোনিয়ার সঙ্গে মমতার আবারও বসার কথা রয়েছে।

টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গে একচ্ছত্র শাসন চালিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দুর্নীতি, জোরজুলুম ও দমনের মাধ্যমে দলটিকে একসময় অপরাজেয় মনে হতো। কিন্তু গত ৪ মে-র নির্বাচনের পর সবকিছু বদলে গেছে। মোদি বা বিজেপি ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে তৃণমূলের দুর্গ। দলটির দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের অপশাসনই যেন তাদের পতন ডেকে এনেছে। ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে অভিষেকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ফেটে পড়ে। ১০০-র বেশি কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন, দলের শীর্ষ নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় মমতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা (এলওপি) হয়েছেন এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন যে, দলের ২৮ জন এমপির মধ্যে ২০ জনেরও বেশি সদস্যের সমর্থন নিয়ে তারা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।

১৯৯৮ সালে নিজের হাতে গড়া দলটির ওপর মাত্র এক মাসের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন মমতা। তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইনি লড়াই শুরু করলেও শিবসেনা বা এনসিপি-র অতীত নজির মনে রাখলে তার জয়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ বিদ্রোহী বিধায়ক ও সাংসদদের সংখ্যা দলত্যাগ বিরোধী আইনকে অকার্যকর করার জন্য যথেষ্ট। এই পরিস্থিতিতে বিদ্রোহীদের হাত থেকে নিজের তৈরি রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে দলের একীভূতকরণ বা বিলীন হওয়াই মমতার একমাত্র পথ হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ভাতিজা অভিষেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত করতে পারবেন।

তবে এই একীভূতকরণের গুঞ্জনে পানি ঢেলে দিয়েছেন তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরে থাকা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেছেন, ৬৪ জন বিদ্রোহী বিধায়ক এবং প্রায় ২০ জন এমপি কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলকে বিলীন করার এই পদক্ষেপকে কোনোভাবেই সমর্থন করবেন না। ঋতব্রত বলেন,

আমাদের বিধায়কেরা এটি করবেন না। ২০ জন এমপি আছেন যারা কংগ্রেসে যাবেন না, তাহলে বিলীন হচ্ছেটা কে? কংগ্রেসের সঙ্গে এমন কোনও একীভূতকরণের প্রশ্নই ওঠে না।

গত ৫ জুন শিবসেনা (ইউবিটি) সাংসদ সঞ্জয় রাউত প্রস্তাব করেছিলেন যে, বিজেপির আধিপত্য রুখতে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যাওয়া সব দলের আবার মূল দলে ফিরে আসা উচিত। তিনি বলেন, “তৃণমূল, এনসিপি এবং কংগ্রেসের অন্যান্য দলছুট অংশগুলোর উচিত তাদের মূল দলে একীভূত হওয়া।”

বুধবার এই সম্ভাব্য একীভূতকরণের বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়। প্রবীণ সাংবাদিক প্রভু চাওলা এক্সে লিখেছেন,

কংগ্রেস কি ডুবন্ত তৃণমূলকে বাঁচাতে কোনও অপারেশন শুরু করেছে? তা না হলে রাজনীতিতে প্রায় নিষ্ক্রিয় সোনিয়া গান্ধী মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মমতা ও অভিষেকের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করার পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনও গল্প আছে। এটি হয় দুই দলের একীভূতকরণ, অথবা দলকে বাঁচাতে অভিষেককে সরিয়ে দেওয়ার কোনও চেষ্টা।

সাংবাদিক ও লেখক সাবা নকভিও মন্তব্য করেছেন যে, এই একীভূতকরণ তৃণমূলকে রাজ্যের ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে নিয়ে আসবে এবং কংগ্রেসের শক্তিশালী ভোটব্যাংক তৈরিতে সাহায্য করবে। প্রবীণ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইও তার এক নিবন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, আরেকটি ভঙ্গুর বিজেপি-বিরোধী জোট গড়ার চেয়ে কংগ্রেসের এই শাখা দলগুলোর রাজনৈতিক পুনর্মিলন ঘটানো উচিত কি না।

দিল্লির সাংবাদিক সঞ্জয় সিং দাবি করেছেন, “চুক্তি চূড়ান্ত ও যেকোনও মুহূর্তে দল বিলীন হওয়ার ঘোষণা আসতে পারে।” তার দাবি অনুযায়ী, সোনিয়া গান্ধী মমতার সামনে দুটি প্রস্তাব রেখেছেন। প্রথমত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কংগ্রেসের জাতীয় সহ-সভাপতি করা হবে এবং দ্বিতীয়ত, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে করা হবে কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক।

এই প্রস্তাবের পর মমতা কিছুটা সময় চেয়েছেন এবং সারারাত ধরে আলোচনা চলেছে। পরদিন সকালে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে অভিষেকের বৈঠক ‘ভালো’ হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিষেকও নিজস্ব কিছু প্রস্তাব রেখেছেন, যার মধ্যে মমতাকে রাজ্যসভায় পাঠানো এবং মল্লিকার্জুন খাড়গের পরিবর্তে তাকে উচ্চকক্ষের বিরোধী দলনেতা করার দাবি রয়েছে।

অবশ্য বেশ কিছু সাংবাদিক এই একীভূতকরণের দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছেন। দ্য হিন্দু পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোনিয়া ও মমতার বৈঠকটি মূলত ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ জোটের কৌশল নির্ধারণের জন্য ছিল।

অতীতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে মমতা খুব একটা নিয়মিত ছিলেন না। অনেক সময় তিনি নিজে না গিয়ে অভিষেক বা ডেরেক ও’ব্রায়েনকে পাঠাতেন। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বেঙ্গালুরু এবং সেপ্টেম্বরে মুম্বাইয়ের বৈঠকে যোগ দিলেও এরপর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক তিনি এড়িয়ে গেছেন। তবে রাজ্যে বড় বিপর্যয়ের পর গত ৮ জুন তিনি আবারও দিল্লির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে হাজির হন।

কংগ্রেসের সঙ্গে মমতার সম্পর্ক দুই দশকেরও বেশি পুরোনো। ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধ এবং সিপিআইএম-এর বিরুদ্ধে হাই কমান্ডের নরম মনোভাবের প্রতিবাদে তিনি দল ছেড়েছিলেন। ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে হারিয়ে তিনি বাংলায় নতুন ইতিহাস গড়েন। আজ ইতিহাস যেন এক পূর্ণ বৃত্ত সম্পূর্ণ করার মুখে দাঁড়িয়ে। যে নেত্রী একসময় বাংলায় কংগ্রেসকে নিশ্চিহ্ন করেছিলেন, আজ কি তিনি নিজেই মূল জাহাজে ফিরে যাবেন? একজন লড়াকু নেত্রী হিসেবে মমতার পক্ষে এটি করা কঠিন হলেও, এই মুহূর্তে তার সামনে বিকল্প পথ খুবই সীমিত। আগামী দিনগুলোতেই জানা যাবে জল শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়।