টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ার মাঝ দিয়ে দৌড়াচ্ছেন ১৮ বছর বয়সী অবন্তিকা সিং। চোখে তীব্র জ্বালা, ঠিকমতো দেখতেও পাচ্ছেন না। তবুও এক হাতে মুঠোফোন উঁচিয়ে চারপাশের বিশৃঙ্খলার দৃশ্য ধারণ করে চলেছেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ভারতের রাজধানী স্থবির করে দেওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শুরু থেকেই যোগ দিচ্ছেন এই তরুণী। বাড়ি ফিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে সেই ঘটনার একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি ক্যাপশন লিখেছেন, ‘আজ আমরা পার্লামেন্টের বেল বাজিয়ে পালিয়ে এসেছি।’
মেধা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে গত ২০ জুলাই ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার সময় ১০ থেকে ২০ হাজার আন্দোলনকারী রাজধানী নয়াদিল্লির প্রধান সড়কগুলো অবরুদ্ধ করে ফেলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সরাসরি নির্দেশে চলা পুলিশি অভিযানে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। তবে এর পর থেকেই ভারতের ইন্টারনেট জগৎ যেন পুলিশি নির্যাতনের প্রামাণ্য চিত্রে পরিণত হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ আন্দোলনের সহিংসতা ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের খবর অস্বীকার করলেও আন্দোলনকারী তরুণদের ধারণ করা ভিডিও ও তথ্যে সামাজিকমাধ্যম সয়লাব হয়ে গেছে।
১২ বছর আগে মোদি ক্ষমতায় আসার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তবে আজকের জেন-জি প্রজন্ম ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ব্যবহৃত সেই একই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেই তাদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
প্রতিবাদস্থলে ঘুরলে মনে হবে যেন ইনস্টাগ্রামের ফিড স্ক্রল করা হচ্ছে। পুরো নয়াদিল্লি ছেয়ে গেছে ব্যানার, ফেস্টুন ও গ্রাফিতিতে। সরকারের সমালোচনা করতে আন্দোলনকারীরা ব্যবহার করছেন চটুল মন্তব্য ও ব্যঙ্গাত্মক ভাষা। ২০ বছর বয়সী ইপ্সিতা গুলিয়ারি বলেন, ‘এই সরকার তরুণদের প্রতি কোনও দায়বদ্ধতা রাখছে না। মোদি ভুল প্রজন্মের সঙ্গে পাঙ্গা নিয়েছেন।’ এই তরুণরা মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাধীন ছোটখাটো মাধ্যমের ওপর নির্ভর করছেন।
ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে, মোদির আইটি সেল দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করলেও এবার রাজপথে তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি তৈরি হয়েছে অনলাইনের একটি বিদ্রূপাত্মক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণদের ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করার পর তৈরি হওয়া ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
সাংস্কৃতিক সমালোচক অনুরাগ মাইনাস ভার্মা বলেন, সরকার বিরোধীদের ওপর আগে যেমন ভয় ছড়িয়ে দিত, এখন আর তা নেই। তরুণরা নিজেদের নিজেরাই ‘ককরোচ’ নামে চিহ্নিত করে একটি একক পরিচয় তৈরি করেছে, যা ইন্টারনেটে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো এই ক্ষোভ ও অসন্তোষের মাত্রা টের পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লিখেছেন, আমাদের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নয়। তবে মোদির এই মন্তব্যকেও ছেড়ে দেয়নি সিজেপি। দলটির নেতা অভিজিৎ দীপকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ছবির ওপর মোদির বক্তব্য জুড়ে দিয়ে এক্স-এ পাল্টা খোঁচা দিয়ে লিখেছেন, হাই, আমার নাম কিছুই না।
সূত্র: আল জাজিরা