ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস অঞ্চলে শনিবার ভোরে ৭.৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এতে অন্তত ৫১ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় সকাল ৫টা ৫৮ মিনিটে ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল পূর্ব নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের এন্ডে শহর থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে। এই ভয়াবহ বিপর্যয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংযোগস্থল হিসেবে পরিচিত ‘রিং অব ফায়ার’-এর দিকে নতুন করে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যানুসারে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পটির ফলে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব উপকূলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। তবে পরবর্তীতে আর বড় কোনও ঝুঁকির আশঙ্কা না থাকায় তা তুলে নেওয়া হয়। বার্তা সংস্থা এপি জানায়, রিউং নামক স্থানে সর্বোচ্চ ১.৬১ মিটার (৫.৩ ফুট) এবং এন্ডে রেসিডেন্সির মাউরোলে ০.৯৪ মিটার উঁচু সুনামির ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে। প্রথম কম্পনের পর অন্তত ২৩৫টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল ৬.২।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া ভূমিধস এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে নাগেকিওসহ ফ্লোরেসের অন্যান্য দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১৫০টিরও বেশি ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস বা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং অন্যান্য সরকারি ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এপি জানায়, প্রায় ২,০০০ মানুষ সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন এবং ১০০টিরও বেশি সরকারি সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ফ্লোরেস অঞ্চলে ১৯৯২ সালেও এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সুনামিতে প্রায় ২,৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি সেই পুরনো স্থানটির বেশ কাছাকাছি অঞ্চলেই ঘটেছে।
কেন ইন্দোনেশিয়ায় এতো ঘনঘন ভূমিকম্প হয়?
ইন্দোনেশিয়া মূলত প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত। এটি প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে ঘোড়ার খুরের আকৃতির একটি বিস্তীর্ণ এলাকা, যেখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের মিলন ঘটেছে। ইউএসজিএস-এর মতে, বিশ্বজুড়ে সংঘটিত সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পগুলোর প্রায় ৮১ শতাংশই ঘটে এই প্রশান্ত মহাসাগরীয় কম্পন বলয়ে। এই অঞ্চলে সাবডাকশন জোন বা একটি টেকটোনিক প্লেট আরেকটি প্লেটের নিচে তলিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার কারণে তীব্র ভূকম্পন ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে।
তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে, সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া বা কলম্বিয়ায় যে ভূমিকম্পগুলো ঘটেছে তা স্বাভাবিক ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। ইউএসজিএস জানায়, একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প বহুদূরের ছোটখাটো কম্পনকে প্রভাবিত করতে পারলেও দীর্ঘ দূরত্বের ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ঘনঘন ভূমিকম্প হওয়ার অর্থ এই নয় যে পুরো রিং অব ফায়ার হঠাৎ অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি
ইন্দোনেশিয়ার এই বিপর্যয়ের কয়েক দিন আগেই পশ্চিম কলম্বিয়ায় চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সে দেশে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৩০০ জনেরও বেশি নিখোঁজ রয়েছেন। ইউএসজিএস জানায়, এই কম্পনটি একটি স্ট্রাইক-স্লিপ ঘটনা ছিল, যেখানে প্লেটগুলোর অনুভূমিক ঘর্ষণের ফলে কম্পন তৈরি হয়।
এর আগে গত জুন মাসে ভেনিজুয়েলায় মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। বার্তা সংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের তথ্যমতে, ভেনিজুয়েলায় ৫,০৬৯ জনের মৃত্যু ও ১৬,৭৪০ জন আহত হন এবং বিশ্বব্যাংকের হিসাবে সরাসরি ১৯.৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় বলয়ের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল
রিং অব ফায়ারের কারণে ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও জাপান, ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড, আলাস্কা, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাংশ, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ সীমানা ভূমিকম্পের চরম ঝুঁকিতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে জাপানের তোহুকুতে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল। আবার ১৯৬৪ সালে আলাস্কায় ৯.২ মাত্রার রেকর্ড সৃষ্টিকারী শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং দক্ষিণ আমেরিকার নাজকা প্লেটের সাবডাকশনের কারণে আন্দিজ পর্বতমালা অঞ্চলগুলোতে প্রায়ই ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
মূলত পৃথিবীর বাহ্যিক শক্ত আবরণ একাধিক টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত যা অবিরত স্থান পরিবর্তন করছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই প্লেটগুলোর সংঘর্ষ, একে অপরের নিচে তলিয়ে যাওয়া কিংবা পাশ কেটে সরে যাওয়ার সময় সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হওয়ার ফলেই এই অঞ্চলটিতে অনবরত ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস