৩২ বছর বয়সী সুরজ শ্রেষ্ঠ যখন বুধবার সকাল ৯টার দিকে ত্রিশুলী-৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ স্থান ত্যাগ করেন, তখনও জানতেন না এমন একটি বিধ্বংসী বন্যা আঘাত হানতে পারে। এর কোনও সতর্ক বার্তাও ছিল না।
নুয়াকোটের কিষ্পাং গ্রামীণ পৌরসভা-৫-এ কর্মরত শ্রেষ্ঠ তার সহকর্মী গণেশ প্রসাইয়ের সঙ্গে ধুঙ্গে বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। প্রায় তিন কিলোমিটার যাওয়ার পর তারা দেখেন পানির স্রোত তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। গর্জনরত ও বৃদ্ধি পাওয়া পানির দৃশ্য ও শব্দে আতঙ্কিত হয়ে দুই জন অবিলম্বে পাহাড়ি রাস্তার দিকে উঠে যান।
বন্যার পানির অগ্রযাত্রা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়ে তারা বনের মধ্য দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার হেঁটে নুয়াকোটের বাটার বাজারে পৌঁছান।
এরপর তারা বিদুরের দিকে যান এবং নেপালি সেনাবাহিনীর ১ নম্বর মৈথালী ব্যারাকের কাছাকাছি পৌঁছান। সেখানে তারা দুপুর ১টা থেকে ত্রিশুলী-৩বি-তে এখনও কাজ করা তাদের সহকর্মীদের খবরের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু রাত ৭টা পর্যন্ত তারা কোনও আশ্বস্ত করার মতো তথ্য পাননি।
নিখোঁজ থাকা আত্মীয়-স্বজন ও অন্যদের তথ্যের জন্য রাত ৮টার মধ্যে ব্যারাকের বাইরে চার ডজনেরও বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। মৈথালী ব্যারাকের মতে, বুধবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ত্রিশূলী বাজারের আশপাশের এলাকা থেকে ৩৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছিল। তারা ব্যারাকে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন, আর যাদের নিবিড় চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল তাদের কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়েছে।
ভোটেকোশী নদীর বন্যায় রসুয়ার পর নুয়াকোট দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদূর-১-এর ধুঙ্গে বাজারে অবস্থিত সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১ নম্বর কোম্পানির সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর রূপেশ রায়ের মতে, ধুঙ্গে বাজারের প্রায় ৪৫টি বাড়ি ত্রিশুলী নদীতে ভেসে গেছে বা চাপা পড়েছে।
অন্য একটি বেদনাদায়ক ঘটনায়, বিদুর-২-এর সিলতায়াঙ্কির ৪৯ বছর বয়সী কিশোরী বিশ্বকর্মা তার বাড়ির নিচতলায় থাকাকালীন হঠাৎ এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করে।
তিনি পালানোর চেষ্টা করলেও পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তার ৩০ বছর বয়সী ছেলে মিলন বিশ্বকর্মা ভোরে গৃহস্থালি জিনিসপত্র কিনতে বাটার বাজারে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, আমার বাবা একটা গাছ ধরে বেঁচে গেছেন। কিন্তু আমার মা বাবার চেয়ে কিছুটা এগিয়ে ছিলেন, তার কোনও খবর আমরা পাইনি। আমার বোন সকালে আগেই কলেজে চলে যাওয়ায় বেঁচে গেছে।
বন্যা ধুঙ্গে থেকে ত্রিশূলী বাজার এবং বেত্রাবতী হয়ে তিমুরে পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, যা ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর উত্তর-পূর্ব তীর বরাবর প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ মিটার পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ধুঙ্গের ওপরের এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ধুঙ্গে বাজারের নিচের সিমালচৌর বস্তিও ভেসে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ধুঙ্গে বাজার এলাকায় পৌঁছানো বাগমতী প্রদেশের পুলিশ প্রধান দীপক রেগমি জানান, বাজারের ওপরের এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং সড়কপথে তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চালানো প্রায় অসম্ভব।
পুলিশের মতে, ধুঙ্গে বাজারের ওপরের প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৯টি মোটর চলাচলের সেতু ভেসে গেছে। ওপরের এলাকার ঘরবাড়ি, হোটেল, স্কুল ও দোকানপাট ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল রেগমি বলেন, আমাদের কাছে এখনও হতাহতের কোনও চূড়ান্ত সংখ্যা বা হিসাব নেই। তবে ভৌত ক্ষতি বিশাল।
টানা বৃষ্টির কারণে সড়কপথে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, আবহাওয়ার উন্নতি হলে বৃহস্পতিবার ভোরে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু করা হবে।
এদিকে বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, নেপালে ভারী বর্ষণজনিত ভয়াবহ বন্যা, পানির তীব্র স্রোত ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। নেপাল পুলিশের আজকের বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬২ জনে। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।