বুধবার সকাল পর্যন্ত নেপালের নুয়াকোট জেলার ভোটেকোশি নদীর তীরে অবস্থিত ১ নম্বর পুল ছিল একটি শান্ত ও মনোরম গ্রাম। কিন্তু আজ সেই গ্রামটি অঞ্চলের অন্যান্য এলাকার মতোই কাদা আর ধ্বংসাবশেষের নিচে তলিয়ে গেছে।
আগে যেখানে ১৯টি বাড়িতে প্রায় ১৫০ জন মানুষের বাস ছিল; ছিল মন্দির, সমবায় ব্যাংক, মুদি দোকান ও শেষকৃত্যের স্থান, সেখানে এখন কেবল সাতটি বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে তিনটি বাড়ির দোতলা পর্যন্ত কাদায় পুঁতে গেছে। ধান ও ভুট্টার খেত কিংবা কলা, আম ও আপেলের বাগানগুলোর অস্তিত্ব আর নেই। ছাদে উপড়ে পড়া কলাগাছ আর কাদায় ঢাকা ন্যাড়া আমগাছ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অংশ হিসেবে নদীর ওপর নির্মিত যে সেতুর নামে গ্রামটির নামকরণ করা হয়েছিল, সেই সেতু, বাঁধের স্লুইসগেট এবং রসুয়া সীমান্তবর্তী ৩ লেনের মহাসড়কটি কাদার নিচে চাপা পড়ে এখন আর চোখে পড়ছে না।
ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা দ্বারকা নাথ প্যাকুরেল বুধবার সকালের সেই বিভীষিকার কথা মনে করে জানান, তিনি যখন বাড়ির তিন তলায় নাস্তা নিয়ে বসেছিলেন, তখনই আঘাত হানে এই পাহাড়ি ঢল। নদীর তীর থেকে মাত্র ৩০ মিটার দূরে ছিল তার বাড়ি। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে জানালাই তাকাতেই তিনি দেখতে পান কালো পানির এক বিশাল দেয়াল ধেয়ে আসছে।
তিনি চিৎকার করে তার পরিবারকে পাহাড়ের ওপরের দিকে দৌড়াতে বলেন। পরিবারের সাতজন বেঁচে গেলেও তার বড় ছেলের বউ প্রাণ বাঁচাতে পারেননি। চোখের পলকে বন্যা গিলে নেয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চাষ করে আসা ধান-ভুট্টার খেত, ফলের বাগান, হাঁস-মুরগি ও ট্রাক্টর। শনিবার প্যাকুরেল ও তার স্ত্রী পাহাড়ে নেমে এসে বাড়ি থেকে কেবল কাদামাখা কিছু কাপড় উদ্ধার করতে পেরেছেন।
প্যাকুরেল বলেন, আমি অনেকবার নদী উপচে পড়তে দেখেছি। গত বছরও আমাদের অর্ধেক ধান ডুবে গিয়েছিল। কিন্তু এমন বন্যা আমি কখনও দেখিনি, এমনকি আমার বাবা-দাদাদের কাছ থেকেও কখনও শুনিনি। আমাদের এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, শুধু শরীরে পরা কাপড় আর আজ নেওয়া এই কটা জামাকাপড় সম্বল।
গ্রামটির প্রায় সব বাসিন্দা এখন নিরাপদ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। প্যাকুরেলের তুতো বোন সীতাও এই বন্যায় তার ছেলের বউ ও নাতনিকে হারিয়েছেন। শনিবার তিনি নিজের বাড়িটি যেখানে ছিল সেই জায়গার দিকে তাকিয়ে কান্না ধরে রাখতে পারেননি।
তবে প্যাকুরেল সামনের দিনগুলোর কথা ভাবছেন। তিনি বলেন, জীবন কাটানোর আর তো কোনও উপায় নেই। আমি যদি শুধু ওই দিনের কথা ভাবতে থাকি, তবে আর বাঁচতে পারব না।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস