সপ্তাহের শুরুর দিকে কোনও ধরনের পূর্বসংকেত ছাড়াই নেপালে এক বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় সাত শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। কিন্তু কোনও বৃষ্টি বা ঝড়ের পূর্বাভাস ছাড়াই এমন ভয়াবহ বন্যা কীভাবে ঘটলো, তা চিন্তায় ফেলেছে গবেষকদের। এই দুর্যোগ আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে, যে ব্যবস্থাগুলো তৈরি করা হয়েছে কেবল ভারী বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি বাড়া পর্যবেক্ষণ করার জন্য, রোদঝলমলে আবহাওয়ায় পাহাড়ের উঁচুতে হঠাৎ ঘটা কোনও ধস শনাক্ত করার জন্য নয়।
মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট এই ধরনের বন্যাকে বলা হয় ব্লু স্কাই ফ্লাড বা নীল আকাশের বন্যা। এমন ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটতে পারে, বিশেষ করে আলাস্কা এবং প্যাসিফিক নর্থওয়েস্টে, যেখানে হিমবাহের পানি হঠাৎ মুক্ত হয়ে পাহাড়ি উপত্যকা ভেসে যেতে পারে। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল ২০০১ সালে ওয়াশিংটন স্টেটের মাউন্ট রেনিয়ারে, যেখানে রোদঝলমলে আবহাওয়ায় হিমবাহের দুর্যোগ মানুষকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্য অনুযায়ী, শনিবার নেপালি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হিমালয় পর্বতমালায় তৈরি এই বন্যায় নেপাল-চীন সীমান্ত অঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং মৃতের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়েছে। নেপালি কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছে, চীন সীমান্তবর্তী উপত্যকাগুলোতে শিগগির আরও পানি ধেয়ে আসতে পারে, যা জীবিতদের খোঁজে চালানো উদ্ধার অভিযানকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
পূর্বসংকেত ছাড়া কীভাবে সৃষ্টি হলো এই বন্যা
ইউএস জিওফিজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর পাশে একটি হিমবাহ ও পর্বতের ধ্বংসাবশেষ ধসে পড়ে। কোনও ভূমিকম্প ছাড়া এই ধসটি ঘটলেও এটি ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমপরিমাণ শক্তি তৈরি করেছিল। উপগ্রহের তথ্যানুযায়ী, বরফ ও পাথরের এই ধসটি নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লেন্দে খোলা নদীকে সাময়িকভাবে আটকে দিয়ে একটি হ্রদ তৈরি করে, যা পরবর্তীতে ফেটে যায়। ভেঙে পড়া হিমবাহটি পথিমধ্যে আরও বরফ, পানি, পাথর ও পলি একত্র করে দ্রুত এক শক্তিশালী ও বিশালাকার রূপ নেয়, যা এই বিস্তৃত বন্যার কারণ হয়। এমনকি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট-এর বিশ্লেষণ অনুসারে, বন্যার মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ত্রিশূলী নদীর পানি ৯ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
এই ধ্বংসাত্মক প্লাবনটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) পথ অতিক্রম করেছে। এর মূল আঘাত পড়েছে তিব্বতের জিরোং কাউন্টি এবং উত্তর নেপালের রসুয়া জেলায়।
গবেষকদের মতে, এই বন্যার আগে কোনও প্রথাগত সতর্কসংকেত ছিল না, ছিল না কোনও বজ্রঝড়, বৃষ্টিপাত, নদীর পানি বৃদ্ধি কিংবা ভূমিকম্প। এটিই হলো ব্লু-স্কাই ফ্লাড, যেখানে বিপদ আসার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত চারপাশের আবহাওয়া ছবির মতো সুন্দর থাকে।
ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসেইন বোনাকদারি এই বন্যা প্রসঙ্গে বলেন, এখান থেকে মূল শিক্ষণীয় বিষয় হলো, বৃষ্টি না থাকার অর্থ এই নয় যে বন্যার কোনও ঝুঁকি নেই।
প্রচলিত সতর্কবার্তা ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো
নেপালের বর্তমান বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা মূলত বৃষ্টিপাত, নদীর পানির স্তর এবং বড় নদীগুলোর প্লাবন পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট জানিয়েছে, এই ব্যবস্থা কেবল বড় নদীগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে, ছোট পানিপথগুলো এর আওতায় পড়ে না। ফলে কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই বন্যা আঘাত হানে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বিশেষজ্ঞরা জানান, পাহাড় বা হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা শনাক্ত করার মতো প্রযুক্তি প্রথাগত ব্যবস্থায় ছিল না। আবহাওয়া রোদঝলমলে থাকা অবস্থাতেই পাহাড়ের অনেক উঁচুতে এই বন্যা শুরু হওয়ায় তা দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে এবং সাধারণ সতর্কবার্তা সংকেতগুলোকে পাশ কাটিয়ে যায়।
অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বোনাকদারি বলেন, এটি পাহাড়ি অঞ্চলের সতর্কবার্তা ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের ভাবনায় একটি বড় পরিবর্তনের নির্দেশ দেয় যে, আমাদের আবহাওয়া ও নদীর পাশাপাশি পাহাড়গুলোকেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
কেন আরও বাড়তে পারে হিমবাহের এই বন্যা
গবেষকরা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি যে এই বন্যার পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি দায়ী কি না, তবে এটিই এখন সবচেয়ে বড় তত্ত্ব। কারণ যেকোনও ধরনের তাপমাত্রা বৃদ্ধি হিমবাহ, স্থায়ী বরফাবৃত মাটি এবং আশেপাশের পাহাড়ের ঢালকে অস্থিতিশীল করে তোলে, যা হঠাৎ ধস ও বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের ভৌগোলিক আলটন বায়ার্স নেচার পত্রিকাকে বলেন, হিমবাহ ভেঙে পড়ার ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয় যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পর্বতের স্থায়ী বরফাবৃত মাটি গলতে শুরু করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্বজুড়ে এমন ঘটনা আরও সাধারণ হয়ে উঠতে পারে। আর যেহেতু পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে, তাই আকস্মিক বন্যা কীভাবে শনাক্ত করা যায় সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, আপনি এই ধরনের ঘটনা আগে থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবেন না।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা যেসব অঞ্চল চরম আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে আগাম শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় আরও বেশি বিনিয়োগ করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।
সূত্র: অ্যাক্সিওস